22/10/2023
ভ্রমণকাহিনী: ০১
ভূতের পার্ক থেকে ম্যানগ্রোভ অরণ্যে: একদিন (হিলটপ পর্ব)
লিখেছেন: নওশীন নিশাত
পাহাড়ের চূড়া বেয়ে নামতে গিয়ে আমরা হঠাৎ পথ হারিয়ে ফেলি। ভূতের অরণ্যে ঘুরতে এসে বুকের ভেতর ধুকপুক করতে থাকে। কোন পথে ফিরবো আমরা!!
ট্যাক্সির দুলুনি খেতে খেতে অভয় মিত্র ঘাটের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। সবার মুখে হাসি আর প্রচন্ড উৎসাহ। আজ ভুতের সাথে হবে সখ্যতা। আবিষ্কার করবো হিলটপ। সকালের নাস্তায় এনার্জি যোগ করতে ফিরিঙ্গি বাজার থেকে এক কাঁদি কলা নেয়া হয়। ভূত মোকাবেলা করতে হবে কিনা!
বেলা ৮:৪৫ টায় আমরা অভয়মিত্র ঘাটে পৌঁছুলাম। সেখানে আমাদের তিনজন সহযোদ্ধা আগেই উপস্থিত হয়ে গেছেন।বহুদিন পর নদী, নৌকা,লঞ্চ দেখে মনে হচ্ছিল আহা মায়ের কোলে ফিরে এলাম।নৌকায় ওঠার আগে সবাইকে একটু পরিচয় করিয়ে দিই । আমি Nowshin Nishat , আমার নেইম টুইন Nishat Tasnim , Khobaib Hamdan Shahadat Hossain Hossain Elias Sajibur Rahman Sadman Nafisa Nabi , বাঁধন, আহনাফ ,সায়ীদ,শিশির আজাদ ভাইয়া।
নৌকার গড় গড় মিউজিকে পানি নিয়ে খেলতে খেলতে আমরা কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে আসি। পরে চৌমুহনী থেকে সিএনজি করে পৌঁছাই মোহসেন আউলিয়া কলেজ গেইটে। সেখানে চায়ের দোকানে সবাই মিলে হৈচৈ করে আমাদের সকালের নাস্তা শেষ করি।
আমরা গন্তব্যের একেবারে কাছেই। এক পা দু পা করে এগিয়ে চলেছি। আমাদের পায়ের শব্দে বুকের ভেতর কাপুনি ধরেছে,সবাই যখন কথা বলছে গা হিম করা সতর্ক ধ্বনি ছড়িয়ে যাচ্ছে। সামনে কি এগিয়ে যাব?নাকি দৌড়ে পালিয়ে যাব এই পথ ছেড়ে?
কি পাঠক ভয় পেয়েছেন? হ্যাঁ আপনার মতই ভয়ে পা থেকে ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত শুকিয়ে গেছিল হিল টপ পার্কের ভূতগুলোর। যেভাবে গমগম করে আমরা বীরদর্পে এগোচ্ছিলাম তাতে ভূতের বাপও রাজ্য ছেড়ে পালিয়েছে। সাথে ক্লাইম্যাক্স যোগ করেছে হামদান ভাইয়া। ওনার গলা ছেঁড়া হাঁকডাকে ভূত কয়েক মাইলেও পা রাখার সাহস পাবে না।
আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে হিলটপ পার্কের পেছনের দেয়াঙটা আগে বিচরণ করে আসি।পথ চলতে নাম না জানা এক বেগুনি ফুলের সাথে দেখা।পথের বাকেই মাঝেমধ্যে লুকোচুরি খেলছিল আমাদের সাথে। মাথার উপরে কাঠফাটা রোদ কিন্তু উত্তেজনার আতিশয্যে আমাদের মাথা ফাটছিল না।
আশেপাশের সব লাল মাটির পাহাড়। পথিমধ্যে শিয়াল মামার বাসায় এসে উপস্থিত হলাম আমরা।কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস শেয়াল মামা বাড়ি ছিল না। সেই দুঃখে শান দিতে সবাই একটা ফন্দি আঁটে।আমি,নিশাত আপু আর নাফিসা আপু একটু পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। খানিক পরে দুইটা পথ দুদিকে চলে গেছে। এই মোড়ে বাকিরা লুকিয়ে পড়ে। আমরা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাকিরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল নতুন আহট সৃষ্টি করার। কি পাঠকরা, ভয় পেয়েছিলাম আমরা? আপনাদেরই দায়িত্ব দিলাম সেই উত্তর খোঁজার।
আমরা হিল টপের শেষ সীমানায় এসে পৌঁছায়। সেখানে ছিল একটা গণ কবরস্থান। যেখানে দুইজন মেয়েকে খুবই নির্মমভাবে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছিল।কি বিভৎস এক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে সেখানকার গাছগুলো। এত শক্তিশালী পাহাড়ও তাদের রক্ষা করতে পারেনি সেদিনকার ১৭ জন নরখাদক থেকে। হয়তো তারই শাস্তি স্বরূপ পাহাড়গুলো তাদের ছাপ বয়ে বেড়াবে আজীবন। তাদের দুজনকে বুকের মধ্যে নিয়ে দেখবে হাজার পথিকের চাপা ক্ষোভ, কষ্ট, ধিক্কার।
এবারের উদ্দেশ্য হিলটপ। ততক্ষণে সবাই একটু ক্লান্ত। চারদিকে পাহাড় আর গাছ, মাথার উপর খাড়া সূর্য। একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সবাই। গা ছমছম করা পরিবেশ।এরই মধ্যে শাহাদাত ভাইয়া জ্বীন ভূতের কথা বলে ভয় লাগাতে শুরু করে। এবার সত্যিই ভয় পাচ্ছিলাম।
যে পথে এসেছি সে পথে ফেরার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শিশির ভাইয়া অন্য পথ ধরে । যেহেতু ওনাদের জানাশোনা ছিল আমরা লক্ষ্মীমন্ত বাবুর মতো ওনাদের পিছু ধরি। একটু এগোতেই সামনে পড়ে পানি। পানিপথের যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখে নতুন পথে বেছে নেয় সবাই। গন্তব্যের পরিবর্তে পৌঁছে যাই বিশাল পাহাড়ের কাছে। মহান স্রষ্টা এতো কারুকার্য খচিত করে তাকে পাঠিয়েছেন একবার না ছুঁয়ে ফিরতে কারো মনে সায় দিচ্ছিল না।
ছুঁয়ে দেখতে গিয়ে কখন যে একেবারে চূড়াই উঠে পড়ি । সেখানে শিশির ভাইয়া চিৎকার করে বলে " আমার একটা পাহাড় কেনার শখ ছিল"। তার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে পুরো চরাচরে ছড়িয়ে পড়ে। নাফিসা আপু এক পাশে চুপচাপ প্রকৃতির বিশালতার হারিয়ে যায়। ইলিয়াস ভাইয়া ও তার প্রতিক্ষীত সুরঞ্জনাকে খুঁজে পেয়েছিল হয়তো। বাঁধন ভাইয়া বাঁধন ছিঁড়ে প্রকৃতির বাঁধনে জড়িয়ে গেছিল ততক্ষণে।
একটা গাছের ছায়ায় হামদান ভাইয়া,নিশাত আপু,সাদমান,আহনাফ ভাইয়া, শাহাদাত ভাইয়া, শিশির ভাইয়া আমি বসেছিলাম। ক্লিক করে প্রকৃতি ধরার ও খানিকটা চেষ্টা চলছিলো। ততক্ষণে প্রকৃতির কোল থেকে আড়মোড়া ভেঙে আমাদের সাথে যোগ হয় সায়ীদ ভাইয়া।
প্রচন্ড তৃষ্ণা পেয়েছিল কিন্তু পানি শেষ সবার। এই মায়াবিনীর মায়াজাল কেটে হিলটপ পার্কে পৌঁছতেই হবে। তরতর করে নামছিলাম আমরা। ভিন্ন পথে ফিরছি।এবার বাঁধল বিপত্তি। কিছুদূর গিয়ে পথ শেষ।পথ হারিয়ে ফেলেছি আমরা। বুকের মধ্যে দুরুদুরু করতে শুরু করে।
আর কোন নতুন আবিষ্কার নয়।ধড়ে প্রাণটা সুস্থ ভাবে নিয়ে আব্বু আম্মুর কাছে দিতেই হবে। যে পথে এসেছি সেই পথে ফিরবো। গুগল ম্যাপে হিলটপ আশেপাশেই দেখাচ্ছে কিন্তু পথ খোঁজা মুশকিল।
অবশেষে ঝড়-ঝাপটা পাড়ি দিয়ে আমরা যখন ভুতের রাজ্যে পৌঁছাই তখন বেলা গড়িয়ে দুপুর।পেছনের ফটক দিয়ে আমরা ঢুকে পড়ি। সেই ব্রিটিশ আমলে তৈরি দালান গুলো এক কালোছাপ বয়ে বেড়াচ্ছে যুগ যুগ ধরে।একা দাঁড়িয়ে তাদের চোখে চোখ রাখার দুঃসাহস চিন্তাও করতে পারছি না। এক পাশে পরিত্যক্ত ঘর গুলো ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে।তাদের সবচেয়ে বড় ভয় মানুষ। অসমাপ্ত দেয়ালের বের হয়ে থাকা লোহার রড যেন মুষ্টি বদ্ধ হাত। তার বুকে মানুষের পদচারণায় মস্তিষ্ক ছিঁড়ে বের হয়ে আসে প্রতিবাদী সুর। সিঁড়ি বেয়ে আমরা সবাই উপরে উঠি। সিঁড়ি গুলো কোথাও একটু ভাঙাচোরা কোথাও চামড়া ছিলে গেছে।
উপরে বড় খোলা জায়গা। গাছগুলোও তখনকার সময়ে পরিকল্পনামাফিক সারিবদ্ধভাবে লাগানো। চারদিকে জোড়া পথ।এই পথ হতে পারতো কতশত নিষ্পাপ শিশুর হাসিতে মুখরিত। গাছের গায়ে লেগে থাকত তাদের মায়া। বা বাতাসের কানে কোন প্রেমিক যুগলের গল্প জুড়িয়ে দিতো। অথচ মানুষের নির্মমতা তাদেরকে দিয়েছে এক লৌমহর্ষক অতীত। তাদের নাম শুনলে শিশুর মনে জেগে ওঠে ভয়।এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।
সেখানে একপাশে স্থানীয় ছেলেরা ফুটবল খেলছিল। হয়তো তাদের উল্লাসে প্রকৃতি কিছুটা দুঃখ মেটায়।
সাদমান তার ব্লগের জন্য ভিডিও ক্লিপ ধারণ করে। দুইপথের শুরুতে সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কালের সাক্ষীর সঙ্গী হই।
সিঁড়ির পথ ধরে প্রধান ফটকের দিকে যাচ্ছিলাম। পুরো জায়গাটাকে মাঝে রেখে পাহাড়ের ঢাল ধরে আঁকাবাঁকা সিড়িপথ। নিচে নেমে পিছু তাকানোর শক্তি,সাহস অবশিষ্ট আর ছিলো না। মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে কষ্ট আর অবহেলা ছাড়া তোমায় কিছুই দিতে পারিনি।
আমরা গাড়িতে করে চলে যাই চৌমুহনী। ইলিয়াস ভাইয়া, সাদমান, শাহাদাত ভাইয়া মহছেন আউলিয়ার মাজার মসজিদে নামাজ পড়তে যায়।পরে দুপুরের খাবার শেষ করে আমরা গাড়িতে উঠি। কিন্তু আমরা কেউই আর বাসায় ফিরতে পারিনি। কি হয়েছিল আমাদের?
চলবে....