03/07/2025
এযুগের মায়েরা বাচ্চাদের ঘরের কাজ করানো নিয়ে বেশ সচেতন। ছোট থেকে বাচ্চাদের কাজ শেখানো উচিত। সব ধরণের পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে।
বাচ্চাদের বয়স অনুযায়ী ঘরের কাজের ট্রেনিং দেওয়া উচিত তবে ছেলে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আমরা মায়েরা এইখানে এসে একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলি।
ঘরের সব কাজ করানোর চেষ্টা করি, আমিও এর ব্যতিক্রম নই।
এখন ভাবতে পারি, ঘরের কাজ করাবো এখানে ভুলের কি আছে?
এটার উত্তর আমি দিবো না, উত্তর হবে এক শাইখার নসীহা কেন্দ্রীক - "ঘরের কাজ ছেলেকে দিয়ে করিওনা এতে তার মধ্যে মেয়েলি স্বভাব রপ্ত হতে থাকবে।"
এই নসীহা শোনার পর আমি বিষয়টা নিয়ে অনেক ভাবি। তাহলে কি ছেলেকে ঘরের কাজ শেখাবোনা?
কখনো ঘরের মহিলারা অসুস্থ হলে অনেক পুরুষ সহযোগীতার মানসিকতা রাখেনা উল্টো বিরক্ত হয়, তাহলে নিজের সন্তানও এমন হলে? অন্যের মেয়ের অভিশাপের কারণ হবেনাতো?
আমি আমার ছেলেকে দিয়ে অবজার্ভ করার চেষ্টা করি। কন্টিনিউসলি যতদিন ওকে শাক বাছা থেকে ঘরের অন্যান্য কাজ করিয়েছি আমিও ফিল করেছি তার ইন্টারেস্ট ঘরের কাজের প্রতি বাড়ছিলো। আবার না করালেও দেখি সে মেয়েদের কাজকে অসম্মান করতো। ঘরের কাজ তেমন কষ্ট না, পুরুষরা একা কষ্ট করে বাণীতে বিশ্বাস করতো।
পরবর্তীতে আমি শাইখার নসীহা এবং ছেলেদের ঘরোয়া ট্রেনিং বিষয়ে অনেক ভেবে ব্যালেন্স করেছি। আমার বড় ছেলের এখন ৭ বছর রানিং, আমার ব্যালেন্স করা চিন্তা আমি দীর্ঘদিনএপ্লাই করে দুটো জিনিসের বেশ সুরহা করতে পেরেছি। সবার বাচ্চা এক না, তাই মায়েদের বুঝেশুনে এগোতে হবে। আমি কেবল আমার বাচ্চার বিষয়ে যেই বিষয় ব্যালেন্স করেছি সেটা শেয়ার করছি -
প্রথমত ঘরোয়া কাজ শেখানো আর করানোর পার্থক্য বুঝতে হবে। আমি ছেলেকে সব শেখাবো তবে রেগুলার সব করাবোনা। আমি শেখাবো তাকে বোঝাতে ঘরের কাজেও কষ্ট রয়েছে। কতটা সময় আর শ্রম নিয়ে মেয়েরা ঘরকে শান্তির নীড় করে এটা বোঝাবো। সে মোটামুটি শিখে গেলে সব কাজ আমি তাকে রেগুলার করাবোনা। যতক্ষণ আমি কাজ করতে সক্ষম কথায় কথায় ছেলেকে অর্ডার করবোনা। যখন আমি সময় পাচ্ছিনা অথবা অসুস্থ তখন করাবো।
যেমন, আমার ছেলে একটু ছোট বয়স থেকে ঘর ঝাড়ু দিতো আমিও করাতাম। এখন যেহেতু একটু বড় মোটামুটি ঝাড়ু দিতে শিখে গেছে এখন সে নিজে থেকে ঘর ঝাড়ু দিতে চাইলে আমি নিষেধ করি। বলি, এটা তোমার কাজ না আমি করছি। আমার সাহায্য লাগলে জানাবো।
তারমানে এটাও না ছেলেকে প্রতিদিন কোনো কাজই করাবোনা। সাংসারিক কাজগুলো আমার হলেও প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত কিছু কাজ থাকে সেগুলো অবশ্যই ছেলে হোক মেয়ে হোক যার যার কাজ নিজের করা উচিত।
ছেলের সব কাজ আমি করলে ভবিষ্যতে ছেলে বউর গালি আমার খাওয়া লাগবে।
স্ত্রী স্বামীর খিদমত করা মানে এটা নয়, স্বামী বাইরে থেকে এসে জুতা কোথাও ছুড়ে মারবে, ফ্রেশ না হয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়বে, একটা কাপড় নিতে গিয়ে পাঁচটা এলোমেলো করে ফ্লোরে ছিটিয়ে রাখবে। খাবার খেয়ে ময়লা যেখানে সেখানে ফেলে রাখবে। ওয়াশরুম/বেসিন ইউজ করলে ম্যাসি করে রাখবে।
এজন্য ব্যাসিক কাজগুলো আমি ছেলেকে দিয়ে রেগুলার করাই। যদিও মাঝে মাঝে করেনা তবুও তাগিদ দিতে থাকি। এই বয়সে তাকে আমি যেগুলো করানোর চেষ্টা করি -
১। স্কুল থেকে এসে জুতাসহ ঘরে ঢোকা যাবেনা। জুতা হাতে নিয়ে বাইরে ঝেড়ে যথাস্থানে রাখা। স্কুলের ব্যাগ জায়গামত রাখবে, ড্রেস চেঞ্জ করবে, ফ্রেশ হবে তারপর রেস্ট নিতে পারবে।
২। তার বুক শেলফ তাকেই গোছাতে হবে এটা আমি করবোনা। ডিপ ক্লিনও সে করে।
দুএকবার দেখিয়ে দেই কোনটা কোথায় রাখলে ঠিক হবে এতোটুকি।
৩। খাবার খাওয়ার পর প্যাকেট যেখানে সেখানে ফেলা যাবেনা অবশ্যই ডাস্টবিনে রাখতে হবে এই রুলস ছোট ছেলের জন্যও।
৪। কাপড় শুকানোর পর তার কাপড় আমি রাখিনা। আমাদেরটা রাখি, তার টা তাকে রাখতে দেই। এবার ভাজ পারুক না পারুক নিজের কাপড় নিজের ড্রয়ারে রাখে।
৫। পানির বোতল ফিল্টার টু ফ্রিজ করার দায়িত্ব তার। মাঝে মাঝে কাপড় আনাই, গাছে পানি দেওয়াই। কজ আমি যখন তখন বেলকনিতে যেতে পারবোনা নিকাব করা লাগে। কর্লিং বাজলে জিজ্ঞেস করে গেইট খোলার দায়িত্বও তার, ভয়েজ না চিনলে তখন আমি যাই।
৬। নিজেদের খেলনা সবসময় নিজেদেরই গোছাতে হবে। সুতরাং এলোমেলো করো সমস্যা নেই। খেলে ভাইকে সাথে নিয়ে গোছাবে।
মোটামুটি এগুলো তাকে রেগুলার করাই। এর বাইরের সাংসারিক কাজ বয়সভেদে শিখাচ্ছি তবে করতে আসলে করতে দেইনা।
আমি তাকে বোঝাই, তুমি পুরুষ তোমার জগত বাহিরে। শুধু ঘরোয়া কাজের চিন্তা তোমার পুরুষ সত্ত্বাকে ঢেকে দিবে। আমি চাইনা তুমি ঘরের কাজ সামলাবে আর তোমার উপর যাদের জিম্মাদারি রয়েছে তারা বাইরের কথা চিন্তা করবে। তোমার গাইরত হবে, তোমার জীবদ্দশায় কোনো মাহরাম জীবিকার দিকে হাঁটবেনা। তুমি সিংহের মতো বিচরণ করো, বিড়াল নিয়ে খেলার সময় তোমার নেই। ময়দানে বীরেরা খেলে তরোয়ারি নিয়ে, বাঁচতে হলে সেভাবেই বাঁচো।
আমি চাই গৃহিনীদের অক্ষমতা আসলে তুমি ঘরে সাহায্য করার মানসিকতা রাখবে। মেয়েদের কাজকে ছোট করে দেখবেনা। এতোটুক সহানুভূতি দেখিয়ে ব্যস তোমার জগতে তুমি পাড়ি দেও। তুমি বাইরে লড়ো, তোমাকে কেউ আঘাত দিলে মাইর খেয়ে এসোনা। ভুল করলে ক্ষমা করো, রিপিট করলে তুমিও মারো। তোমাকে কেউ ফাঁসালে মেয়েদের মতো ভেঙ্গে পড়োনা, রুখে দাঁড়াও। সাহসীকতার সাথে সৎ পথে নিজেকে প্রমাণ করো। তোমার মাহরামদের কেউ অসম্মানের দৃষ্টি দিলে তার চোখ উপ্রে ফেলো। তুমি কাঁদবেনা, কান্না তোমার সিফাত না। তুমি আবেগ দিয়ে বিচার করবেনা, তুমি বিবেক দিয়ে বিচার করবে, বিচক্ষণ হবে।
এই সবগুলো বিষয় একদিনে বলিনা, আস্তে আস্তে বপনের চেষ্টা করছি। আমি বলছিনা আমি সফল, আমি বারবার বলছি চেষ্টা করছি। মা হিসাবে আমার অনেক দূর্বলতা রয়েছে, আমি আদর্শ মা নই। আমি জানি নবীর সন্তানও পথ ভ্রষ্ট হয়েছে, সবই আল্লাহর হিকমাহ। সুতরাং আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে, সন্তানের জন্য বাবা মাকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো থেকে আমি ভীষণভাবে পানাহ চাই।