19/09/2026
সন্ধ্যার আজান তখনো হয়নি। দিনের আলো সরে গিয়ে চারপাশে সন্ধ্যার আধার নামছিল। পাড়ার গলির দোকান গুলোতে একে একে বাতি জ্বলে উঠছিল। গলির ভেতর কয়েকটা শিশু খেলা শেষ করে বাড়ির দিকে ফিরছিল। কারও হাতে ক্রিকেট ব্যাট, কারও হাতে চিপসের ঠোঙা। কেউ কেউ বন্ধুর সাথে আজকের জন্য শেষ গল্পটুকু শেষ করছিলো। কারও মুখে দিনের শেষ হাসিটুকু তখনো লেগে ছিল।
সেই শিশুদের ভিড়েই ছিল আট বছরের রাফি। খেলা শেষে বাসায় ফিরে যাওয়ার আগে প্রতিদিন পাশের মুদি দোকান থেকে সে একটা ছোট চকলেট কিনত। সেদিনও কিনেছিল।
সে দোকানে যেতেই দোকানদার তাকে দেখে হেসে বলেছিল,
---আজ আবার চকলেট?
রাফি মিষ্টি করে হেসে বলেছিল,
--- হ্যা তবে বেশি নিব না, আম্মু বলছে বেশি চকলেট খেলে দাঁত পড়ে যাবে তাই আজকে একটা খাব।
দোকানদারও হেসেছিল।
--যাও, আম্মুকে বলো দোকানদার কাকা দিয়েছে।
রাফি চকলেটটা হাতে নিয়ে গলির দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল। সেই হাঁটাটাই ছিল তাকে শেষবার দেখার মুহূর্ত। তারপর আর কেউ তাকে দেখেনি।
--------
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। রাফির মা নাসরিন বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিলেন। এক চুলায় ভাত বসানো। আরেক চুলায় বসানো তরকারিতে শেষবারের মতো লবণ দেবেন বলে হাত বাড়িয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ হাতটা থেমে গেল। মনে হলো, রাফি এখনো ফিরল না? প্রথমে নিজেকেই বোঝালেন, হয়তো পাশের বাসায় গেছে। কিন্তু তার মন মানতেছিলো না তরকারি নামিয়েই পাশের বাসায় গেলেন খোঁজ করতে।
---আপা, রাফি কি এখানে?
---না তো।
আরেকটা বাড়ি, তারপর আরেকটা। কেউ জানে না।
নাসরিনের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছিল। সবাই বলছে, "চিন্তা করো না চলে আসবে এখনই", কিন্তু একজন মায়ের ভয় অনেক সময় কোনো অপেক্ষা করে না। যুক্তি যখন বলে, "হয়তো একটু পরেই ফিরে আসবে", মায়ের মন তখন বলে ওঠে, না ওর হয়ত কিছু একটা ঠিক নেই।
তিনি ছেলের বাবাকে ফোন করলেন।
---শুনছো? রাফি এখনো বাসায় আসেনি। ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ হলো না। তারপর স্বামী বললেন,
---কী বলছ? ও তো তোমার অফিস থেকে ফেরার আগেই বাসায় চলে আসে।
---আজ আসেনি।
---তুমি ভালো করে খুঁজেছ?
---সব জায়গায় খুঁজেছি।
শেষ কথাটা বলতে গিয়েই নাসরিনের গলা ভেঙে গেল।
---আমার ছেলেটাকে কোথাও পাচ্ছি না।
ওপাশে তার স্বামীও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর শুধু বললেন,
---চিন্তা করো না, আমি আসছি।
অনেক সংসারের দিন কাটে ছোট ছোট হিসাবের মধ্যে।
বাজারের টাকা, বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুলের বেতন, বিদ্যুৎ বিল। মাসের শেষে হাতে কত টাকা থাকবে,সেই হিসাব। কখনো এসব নিয়েই স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয় কখনো স্ত্রী অভিমান করে বলেন,
---তুমি সংসারের জন্য সময় দাও না।
স্বামী ক্লান্ত গলায় বলেন,
---সংসারের জন্যই তো সারাদিন বাইরে থাকি।
কথা জমে থাকে, অভিমান জমে থাকে। তারপর রাত নামে। একই ঘরে দুজন মানুষ পাশাপাশি শুয়ে থাকে, অথচ মাঝখানে অদৃশ্য একটা দূরত্ব পড়ে থাকে। কিন্তু সন্তানের কিছু হয়ে গেলে সেইসব অভিমান হঠাৎ কত তুচ্ছ মনে হয়। সেদিন রাফির বাবা-মায়েরও তাই হয়েছিল। সেদিন তারা শুধু স্বামী-স্ত্রী ছিলেন না। কে কাকে কতটা সময় দিয়েছে, কে সংসারের জন্য কতটা করেছে, এসবের কোনো হিসাব সেদিন তাদের কাছে ছিল না। তারা শুধু একজন নিখোঁজ শিশুর বাবা-মা ছিলেন।
--------
রাত আটটা দশ মিনিটে তারা থানায় গেল। নাসরিন ফোনে ছেলের ছবিটা দেখাচ্ছিলেন।
---স্যার, আমার ছেলেটা হারিয়ে গেছে।
ডিউটিতে থাকা পুলিশ সদস্য কাগজপত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন,
---কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না?
---সন্ধ্যার পর থেকে।
---কারও সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল?
---না, আমার ছেলে ভীষণ শান্ত প্রকৃতির ওর সাথে কারোর সাথে ওর ঝগড়া হওয়ার কথা না।
---কোনো আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল?
---না।
---বয়স কত?
---আট।
পুলিশ সদস্য ফোনের ছবিটার দিকে একবার তাকালেন। তারপর বললেন,
---একটু অপেক্ষা করেন। হয়তো কোথাও গেছে, ফিরে আসবে।
নাসরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
---স্যার, ও কখনো আমাকে না বলে কোথাও যায় না।
---আপনারা আগে আত্মীয়স্বজনের বাসায় খোঁজ নেন।
রাফির বাবা এবার নিজেকে সামলে বললেন,
---স্যার, আমরা সব জায়গায় খুঁজেছি। আপনারা যদি একটু....
পুলিশ সদস্য কথাটার মাঝখানে থামিয়ে দিলেন,
---দেখুন, আমরা তো বসে নেই। আপনারা একটা লিখিত অভিযোগ দিয়ে যান।
সেই রাতেই অভিযোগ করা হলো। কাগজে রাফির নাম লেখা হলো, বয়স লেখা হলো, ঠিকানা লেখা হলো। কিন্তু একটা শিশুর নাম কাগজে লেখা আর তাকে খুঁজে পাওয়া, এই দুইয়ের মাঝখানে যে অন্ধকারটা তৈরি হয়েছিল, সেটার কোনো হিসাব সেই কাগজে ছিল না।
--------
রাত আরও গভীর হতে লাগল। পাড়ার মানুষজন বেরিয়ে এল। কেউ টর্চ হাতে গলিতে খুঁজল, কেউ পুকুরের ধারে গেল। কেউ মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিল। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাফির ছবি ছড়িয়ে দিল। এক ঘণ্টার মধ্যেই ছবিটা শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে গেল। কেউ লিখল, "দয়া করে শেয়ার করুন।" কেউ লিখল, "আল্লাহ শিশুটাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দিন।" কেউ লিখল, "দেশে এসব কী হচ্ছে!" সবাই চিন্তিত। সবাই রাফিকে খুঁজছে।
কিন্তু রাত যত বাড়ছিল, একটা প্রশ্ন তত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, এই শিশুটাকে খুঁজে বের করার দায়িত্বটা আসলে কার? শুধু তার বাবা-মায়ের? শুধু পাড়ার মানুষের? নাকি এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থারও, যেখানে একটি শিশু নিখোঁজ হলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত সমন্বিতভাবে তাকে খুঁজে বের করার ব্যবস্থা থাকার কথা।
--------
রাত তিনটার দিকে রাফির বাবা আবার থানায় ফোন করলেন।
---স্যার, কোনো খবর পাওয়া গেছে?
---না।
---কোনো ক্যামেরার ফুটেজ দেখেছেন?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর প্রশ্ন এল,
---কোন ক্যামেরা?
রাফীর বাবা করুণ স্বরে বললেন,
---রাস্তার মোড়ের দোকানের ক্যামেরা। আর স্কুলের সামনে একটা ক্যামেরা আছে।
---সকালে দেখা যাবে।
রাফির বাবা আর কিছু বললেন না। ফোনটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখলেন। সকাল, একটা শব্দ মাত্র। কিন্তু একজন বাবার কাছে রাত তিনটা থেকে সকাল পর্যন্ত সময়টা কখনো কখনো একটা জীবনের মতো দীর্ঘ।
ঘরের দিকে তাকালেন তিনি। নাসরিন তখনো জেগে। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। মেঝেতে বসে কোলে রাফির স্কুলব্যাগ। ব্যাগটা খুলে একে একে জিনিসগুলো বের করলেন তিনি। একটা খাতা, একটা পেন্সিল।
একটা রাবার, দুটো কলম, অর্ধেক খাওয়া বিস্কুট, আর একটা ছোট্ট চকলেটের খালি প্যাকেট। নাসরিন প্যাকেটটা হাতে নিলেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
---আজকে ও চকলেট খায় নি কেনো। তারপর হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমি ওকে বকিনি তো?
রাফির বাবা অসহায় মুখ নিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রাফির মা আবার বলে উঠলেন,
---আজ চকলেট খাওয়ার জন্য ওকে বকিনি তো?
তিনি জানতেন না কেন কথাটা বলছেন। কিন্তু সন্তান হারিয়ে গেলে মায়েরা অনেক সময় বর্তমানের মধ্যে থাকেন না। তারা বারবার ফিরে যান কয়েক ঘণ্টা আগের পৃথিবীতে। শেষবার কখন ছেলেকে দেখেছিলেন। শেষবার কী বলেছিলেন। ছেলেটা কী বলেছিল। আর কোথায় একটু বেশি সাবধান হওয়া যেত। তখন সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রশ্নটা নিজের কাছেই ফিরে আসে, আমি কি আরেকটু সাবধান হতে পারতাম?
--------
পরদিন সকালে রাফির ছবি আরও ছড়িয়ে পড়ল. টেলিভিশনের স্ক্রলে খবর এলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এলেন। কয়েকজন কর্মকর্তা এলেন।
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলা হলো,
---আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।
নাসরিন তখন কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি কারও বক্তব্য শুনছিলেন না। কোনো প্রতিশ্রুতিও সে চায় না। তিনি শুধু একটা কথাই বললেন,
---আমার ছেলে কোথায়?
কেউ উত্তর দিতে পারল না। এই প্রশ্নটা শুধু নাসরিনের ছিল না। এটা সেইসব মায়েদের প্রশ্ন, যারা সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। সেইসব বাবার প্রশ্ন, যারা সকালে কাজে বের হওয়ার সময় সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেন, "দুষ্টুমি করো একদম, ভালো করে থেকো।" এটা সেইসব পরিবারের প্রশ্ন, যারা নিজেদের অনেক স্বপ্ন সরিয়ে রেখে একটা শিশুর ভবিষ্যৎ তৈরি করার চেষ্টা করেন।
বিয়ের পর মানুষ ভাবে, সংসার মানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। তারপর সন্তান আসে। ঠিক তখনই সংসারের অর্থ বদলে যায়। একটা ছোট্ট মানুষকে ঘিরে দুজন মানুষের জীবন, স্বপ্ন, অভিমান, ক্লান্তি, সবকিছু নতুন অর্থ পায়। তখন প্রশ্নটা শুধু হওয়া উচিত নয়, কে সংসারের খরচ চালাবে? কে রান্না করবে? কে সন্তানকে পড়াবে? প্রশ্ন হওয়া উচিত আরও বড়, সন্তানকে নিরাপদে বড় করার দায়িত্বটা কার?
শুধু মায়ের? বাবার? নাকি দুজনেরই? একজন বাবা কি শুধু উপার্জন করলেই তার দায়িত্ব শেষ? একজন মা কি শুধু রান্না, পড়াশোনা আর ঘরের কাজ সামলালেই তার দায়িত্ব শেষ? নাকি বাবা-মা দুজনেরই সন্তানের নিরাপত্তার দিকে সমানভাবে নজর রাখার দায়িত্ব আছে? আর সমাজের? একটা শিশু রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা কি একবার থেমে জিজ্ঞেস করি, তুমি একা কেনো? কোথায় যাবে? নাকি পাশ দিয়ে চলে যাই?
কোনো শিশুকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেখলে আমরা কি বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি? নাকি সহজ একটা কথা বলে পাশ কাটিয়ে যাই, "এটা হয়ত অন্যের পারিবারিক সমস্যার ফল, আমরা কি করব।" কখনো কখনো এই একটি বাক্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে একটা শিশুর বিপদ।
-----------
তৃতীয় দিন সকালে খবরটা এলো। রাফিকে পাওয়া গেছে। কিন্তু যেভাবে তার পরিবার চেয়েছিল, সেভাবে নয়। শহরের প্রান্তের একটি নির্জন জায়গা থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। খবরটা শুনে নাসরিন প্রথমে কোনো কথা বলেননি। তিনি শুধু ছেলের ছবিটা হাতে নিয়ে বসে ছিলেন। ছবিতে রাফি হাসছিল, হাতে চকলেট। যে শিশুটি সেদিন মায়ের কাছে ফেরার তাড়ায় গলির ভেতর দিয়ে হাঁটছিল, সে আর কোনোদিন সেই দরজায় ফিরে আসবে না। ঘরের দেয়ালে তার স্কুলব্যাগটা তখনো ঝুলছিল। খাতার ভেতরে অর্ধেক লেখা একটা বাক্য, আমার বড় হয়ে পুলিশ হওয়ার ইচ্ছা….." বাকিটা আর লেখা হয়নি।
নাসরিন ছেলের স্কুলের পোশাকটা বের করে বিছানায় রাখলেন। অনেকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
---ওর ইউনিফর্মটা ধুয়ে দেব?
ঘরে থাকা মানুষগুলো কেউ উত্তর দিল না। নাসরিন আবার বললেন,
---কাল তো স্কুল আছে।
তারপর থেমে গেলেন। কিছুক্ষণ পর যেন কথাটার অর্থ নিজেই বুঝতে পারলেন। রাফির আর কোনোদিন স্কুলে যাওয়া হবে না। তিনি ইউনিফর্মটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরলেন। এবার আর কান্না থামল না। একজন মা তখন শুধু তার সন্তানের মৃত্যুর জন্য কাঁদেন না। তিনি কাঁদেন সেইসব ভবিষ্যতের জন্য, যেগুলো আর কোনোদিন আসবে না। যে জন্মদিন গুলো আর হবে না। যে পরীক্ষার ফল আর জানা হবে না। যে ভুলের জন্য বকা আর দেওয়া হবে না। যে একদিন বড় হয়ে নিজের পছন্দের মানুষটার কথা বাবা-মাকে বলার কথা ছিল, সেই দিনটাও আর আসবে না। একটা শিশুর মৃত্যু শুধু একটা জীবন থামিয়ে দেয় না। একটা পরিবারের অসংখ্য সম্ভাব্য ভবিষ্যৎও থামিয়ে দেয়।
-----------
রাফির মৃত্যুর পর পুরো এলাকায় শোক নেমে এল।কয়েকদিন সবাই ব্যস্ত হয়ে গেল। মিছিল হলো, মানববন্ধন হলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট হলো। অনেকে প্রতিবাদ করে বলল, "অপরাধীদের কঠিন শাস্তি চাই।" কেউ বলল, "প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।" কেউ বলল, "শিশুদের নিরাপত্তার জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।"
কিন্তু সময়ের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। কিছুদিন পর মানুষ আবার নিজের জীবনে ফিরে যায়। দোকান খোলে, স্কুলের ঘণ্টা বাজে, অফিস শুরু হয়, বাস রাস্তায় নামে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন খবর আসে। আর এই সব রাফিদের ছবিটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় হাজার হাজার নতুন ছবির নিচে। শুধু একজন মা ভুলতে পারেন না। তার কাছে সময় থেমে থাকে সেই সন্ধ্যাতেই। যেদিন দরজার ওপাশ থেকে ছেলেটা আর ফিরে আসেনি।
---------
রাফির বাবা একদিন থানার সামনে দাঁড়িয়ে একজন কর্মকর্তাকে বললেন,
---আমি কাউকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলতে আসিনি।
কর্মকর্তা চুপ করে শুনছিলেন।
---আমি জানতে চাই, আমার ছেলে যখন নিখোঁজ হয়েছিল, তখন প্রথম এক ঘণ্টায় কী কী করা হয়েছিল?
কেউ উত্তর দিল না। তিনি আবার বললেন,
---তখন কি কোন ক্যামেরার ফুটেজ দেখা হয়েছিল?
নীরবতা।
---তখন কোন কোন জায়গায় খোঁজা হয়েছিল?
নীরবতা।
---কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল?
আবারও নীরবতা।
রাফির বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
---আমার ছেলেকে তো আর ফেরত দিতে পারবেন না। কিন্তু পরের রাফিটাকে যেন ফেরাতে পারেন।
কথাটার মধ্যে কোনো বক্তৃতা ছিল না। কোনো স্লোগান ছিল না। ছিল শুধু একজন বাবার অসহায় প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাফির পরিবারের নয়, সমাজও রাষ্ট্রের কাছেও পাওনা। কারণ রাফির গল্প শুধু একটি শিশুর গল্প নয়। এটা নিরাপত্তার গল্প। এটা আমাদের চারপাশের ভয় গুলোর গল্প। একটা শিশু নিখোঁজ হয়।
কেউ অপহরণের শিকার হয়। কোনো নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন। কোনো মানুষ হত্যার শিকার হন। কোনো বৃদ্ধ মানুষ রাতে বাড়ি ফেরার সময় চারপাশে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে হাঁটেন। প্রতিটি ঘটনার পর কিছু দিন আমরা কথা বলি। ক্ষোভ প্রকাশ করি, বিচার চাই, তারপর সময় চলে যায়। নতুন ঘটনা আসে। পুরোনো খবরটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। কিন্তু ভয়টা থেকে যায়।
প্রশ্নটাও থেকে যায়, "আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে একজন মানুষ ঘর থেকে বের হলে অন্তত এই স্বাভাবিক বিশ্বাসটা রাখতে পারেন যে তিনি নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন?"
একটি ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে একজন বয়স্ক মানুষ, কেউই নিরাপদে চলাফেরার নিশ্চয়তাটুকু পুরোপুরি অনুভব করতে পারে না, এমন পরিস্থিতি আমাদের ভাবায়। একজন মানুষ ঘর থেকে বের হলে সে নিরাপদে আবার ঘরে ফিরবে, এই স্বাভাবিক নিশ্চয়তাটুকুও যদি অনিশ্চিত হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি যেন একই জায়গায় পড়ে না থাকে, এটা নিশ্চিত করা জরুরি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইন থাকা দরকার। আইনের কার্যকর প্রয়োগ দরকার।
দ্রুত তদন্ত দরকার। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা দরকার। ভুক্তভোগী পরিবারকে সহযোগিতা দরকার। অপরাধের বিচার দরকার। আর তার পাশাপাশি অপরাধ ঘটে যাওয়ার আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থাও দরকার। এসব কিছু না পাওয়ায় তাই প্রশ্নটা আবারও থেকেই যায়, "জননিরাপত্তা কি সত্যিই যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে?"
একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়? একটি পরিবার সাহায্যের জন্য থানায় গেলে তারা কত দ্রুত সহায়তা পায়? সংশ্লিষ্ট সংস্থা গুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা দ্রুত হয়? অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করাই কি যথেষ্ট? নাকি কোথায় কোথায় ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছিল, সেটাও খুঁজে দেখা দরকার? কারণ জবাবদিহি শুধু একজন অপরাধীর জন্য নয়। কখনো কখনো একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে আসে।
কিছু প্রশ্ন আবার আমাদের নিজেদের জন্যও। আমরা কি আমাদের সন্তানকে নিরাপত্তা সম্পর্কে শেখাই?
আমরা কি জানি সে কোথায় যায়? কার সঙ্গে যায়?
কোন পথে স্কুলে যায়? আমরা কি তার কথা মন দিয়ে শুনি? নাকি নিজেদের ব্যস্ততার মধ্যে তাকে শুধু বলে দিই, যাও, বাহিরে খেলো গিয়ে।"
আরেকটা প্রশ্ন পরিবারকে ঘিরে। বিয়ের পর কি শুধু একটা সংসার তৈরি করাই দায়িত্ব? নাকি সেই সংসারের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বও আমাদের? একজন বাবা কি শুধু উপার্জন করবেন?
একজন মা কি শুধু সন্তান সামলাবেন? নাকি সন্তানের নিরাপত্তা, তার বেড়ে ওঠা, তার ভয়, সবকিছুর দায়িত্ব দুজনেই ভাগ করে নেবেন?
আর সমাজ? একটা শিশু একা দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা কি একবার থামব? কেউ সাহায্য চাইলে আমরা কি শুনব? কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা দেখলে আমরা কি চুপ করে চলে যাব? নাকি ভাবব, এই শিশুটার নিরাপত্তার সঙ্গেও আমার একটা সম্পর্ক আছে।
কারণ সমাজ শুধু অনেকগুলো বাড়ির সমষ্টি নয়।
সমাজ মানে, একজন বিপদে পড়লে অন্যজনের পাশে দাঁড়ানো।
-------
রাফির বাবা সেই দিন গুলোর কথা ভুলতে পারেননি।
সন্ধ্যা হলেই তার চোখ চলে যেত গলির দিকে। কোনো শিশু দৌড়ে গেলে তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেন।
কোনো বাবা তার সন্তানকে হাত ধরে নিয়ে গেলে তিনি চুপ করে দেখতেন। তারপর হয়তো মনে মনে ভাবতেন, রাফিও তো এভাবেই হাঁটত। হাতে চকলেট থাকত।
বাড়ি ফেরার তাড়া থাকত। আর একটা মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন। শুধু সেই অপেক্ষাটা আর কোনোদিন শেষ হয়নি।
রাফির অসমাপ্ত খাতাটা অনেকদিন তার বাবার কাছে ছিল। একদিন তিনি খাতাটা খুললেন। সেই একই বাক্য, "আমার বড় হয়ে পুলিশ হওয়ার ইচ্ছা…..."
বাকিটা আর লেখা হয়নি। রাফির বাবা অনেকক্ষণ সেই পাতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে খাতাটা বন্ধ করলেন। হয়তো রাফি বড় হয়ে পুলিশ হতে পারেনি। কিন্তু তার অসমাপ্ত বাক্যটা যেন একটা প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেল, যে শিশুর স্বপ্ন ছিল একদিন মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করবে, তার নিজের নিরাপত্তা কে রক্ষা করবে? তাকে কেনো নিরাপত্তাহীনতার জন্য দুনিয়া ছাড়তে হলো?
রাফি ফিরে আসেনি। তার ঘরের দরজা আছে, স্কুলব্যাগ আছে, খাতা আছে, পেন্সিল আছে, কলম আছে, হয়তো কোনো এক কোণে এখনো পড়ে আছে তার চকলেটের খালি প্যাকেট। কিন্তু রাফি আর নেই।
একজন মা চাইলেও এই "নেই" শব্দটার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারেন না। কারণ কিছু শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। রাফির গল্প হয়তো এখানেই শেষ। কিন্তু প্রশ্নটা শেষ নয় কারণ আজ রাফি, কাল হয়তো অন্য কারও সন্তান।
আর কোনো মায়ের দরজায় সন্ধ্যা নামার পর যদি তার সন্তান আর ফিরে না আসে, তখন যেন তাকে শুধু একা দাঁড়িয়ে বলতে না হয়, "আমার ছেলেটাকে খুঁজে দিন।"
তার পাশে যেন পরিবার থাকে, সমাজ থাকে, প্রতিবেশী থাকে, প্রশাসন থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এমন একটি ব্যবস্থা থাকে যেখানে একজন নাগরিকের নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, তার অধিকার হয়। যেখানে একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবরকে "হয়তো ফিরে আসবে" বলে সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া না হয়। যেখানে অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শুধু শোক প্রকাশ নয়, তার আগেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে।
যেখানে একটি পরিবারের কান্না কয়েক দিনের খবর হয়ে হারিয়ে না যায়। কারণ একটি শিশু হারিয়ে যাওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা সময় শুধু কয়েক ঘণ্টা নয়। কখনো কখনো, সেই কয়েক ঘণ্টাই একটা জীবন আর একটা পরিবারের মধ্যকার শেষ দূরত্ব।
নিখোঁজ
সাবিহা ইসলাম লামিয়া
১৯/০৯/২০২৬