স্বপ্নবুনন - Swapnobunon

স্বপ্নবুনন  - Swapnobunon যা বলা হয় না,
তা-ই লিখে রাখি।
অগোছালো অনুভূতিগুলো শব্দে গেঁথে,
শব্দের মাঝে নিজেকে প্রকাশ করি। 📖✨

~সাবিহা ইসলাম লামিয়া

19/09/2026

সন্ধ্যার আজান তখনো হয়নি। দিনের আলো সরে গিয়ে চারপাশে সন্ধ্যার আধার নামছিল। পাড়ার গলির দোকান গুলোতে একে একে বাতি জ্বলে উঠছিল। গলির ভেতর কয়েকটা শিশু খেলা শেষ করে বাড়ির দিকে ফিরছিল। কারও হাতে ক্রিকেট ব্যাট, কারও হাতে চিপসের ঠোঙা। কেউ কেউ বন্ধুর সাথে আজকের জন্য শেষ গল্পটুকু শেষ করছিলো। কারও মুখে দিনের শেষ হাসিটুকু তখনো লেগে ছিল।

সেই শিশুদের ভিড়েই ছিল আট বছরের রাফি। খেলা শেষে বাসায় ফিরে যাওয়ার আগে প্রতিদিন পাশের মুদি দোকান থেকে সে একটা ছোট চকলেট কিনত। সেদিনও কিনেছিল।
সে দোকানে যেতেই দোকানদার তাকে দেখে হেসে বলেছিল,
---আজ আবার চকলেট?
রাফি মিষ্টি করে হেসে বলেছিল,
--- হ্যা তবে বেশি নিব না, আম্মু বলছে বেশি চকলেট খেলে দাঁত পড়ে যাবে তাই আজকে একটা খাব।
দোকানদারও হেসেছিল।
--যাও, আম্মুকে বলো দোকানদার কাকা দিয়েছে।

রাফি চকলেটটা হাতে নিয়ে গলির দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল। সেই হাঁটাটাই ছিল তাকে শেষবার দেখার মুহূর্ত। তারপর আর কেউ তাকে দেখেনি।

--------

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। রাফির মা নাসরিন বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিলেন। এক চুলায় ভাত বসানো। আরেক চুলায় বসানো তরকারিতে শেষবারের মতো লবণ দেবেন বলে হাত বাড়িয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ হাতটা থেমে গেল। মনে হলো, রাফি এখনো ফিরল না? প্রথমে নিজেকেই বোঝালেন, হয়তো পাশের বাসায় গেছে। কিন্তু তার মন মানতেছিলো না তরকারি নামিয়েই পাশের বাসায় গেলেন খোঁজ করতে।
---আপা, রাফি কি এখানে?
---না তো।

আরেকটা বাড়ি, তারপর আরেকটা। কেউ জানে না।
নাসরিনের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছিল। সবাই বলছে, "চিন্তা করো না চলে আসবে এখনই", কিন্তু একজন মায়ের ভয় অনেক সময় কোনো অপেক্ষা করে না। যুক্তি যখন বলে, "হয়তো একটু পরেই ফিরে আসবে", মায়ের মন তখন বলে ওঠে, না ওর হয়ত কিছু একটা ঠিক নেই।

তিনি ছেলের বাবাকে ফোন করলেন।
---শুনছো? রাফি এখনো বাসায় আসেনি। ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ হলো না। তারপর স্বামী বললেন,
---কী বলছ? ও তো তোমার অফিস থেকে ফেরার আগেই বাসায় চলে আসে।
---আজ আসেনি।
---তুমি ভালো করে খুঁজেছ?
---সব জায়গায় খুঁজেছি।
শেষ কথাটা বলতে গিয়েই নাসরিনের গলা ভেঙে গেল।
---আমার ছেলেটাকে কোথাও পাচ্ছি না।
ওপাশে তার স্বামীও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর শুধু বললেন,
---চিন্তা করো না, আমি আসছি।

অনেক সংসারের দিন কাটে ছোট ছোট হিসাবের মধ্যে।
বাজারের টাকা, বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুলের বেতন, বিদ্যুৎ বিল। মাসের শেষে হাতে কত টাকা থাকবে,সেই হিসাব। কখনো এসব নিয়েই স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয় কখনো স্ত্রী অভিমান করে বলেন,
---তুমি সংসারের জন্য সময় দাও না।
স্বামী ক্লান্ত গলায় বলেন,
---সংসারের জন্যই তো সারাদিন বাইরে থাকি।
কথা জমে থাকে, অভিমান জমে থাকে। তারপর রাত নামে। একই ঘরে দুজন মানুষ পাশাপাশি শুয়ে থাকে, অথচ মাঝখানে অদৃশ্য একটা দূরত্ব পড়ে থাকে। কিন্তু সন্তানের কিছু হয়ে গেলে সেইসব অভিমান হঠাৎ কত তুচ্ছ মনে হয়। সেদিন রাফির বাবা-মায়েরও তাই হয়েছিল। সেদিন তারা শুধু স্বামী-স্ত্রী ছিলেন না। কে কাকে কতটা সময় দিয়েছে, কে সংসারের জন্য কতটা করেছে, এসবের কোনো হিসাব সেদিন তাদের কাছে ছিল না। তারা শুধু একজন নিখোঁজ শিশুর বাবা-মা ছিলেন।

--------

রাত আটটা দশ মিনিটে তারা থানায় গেল। নাসরিন ফোনে ছেলের ছবিটা দেখাচ্ছিলেন।
---স্যার, আমার ছেলেটা হারিয়ে গেছে।
ডিউটিতে থাকা পুলিশ সদস্য কাগজপত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন,
---কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না?
---সন্ধ্যার পর থেকে।
---কারও সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল?
---না, আমার ছেলে ভীষণ শান্ত প্রকৃতির ওর সাথে কারোর সাথে ওর ঝগড়া হওয়ার কথা না।
---কোনো আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল?
---না।
---বয়স কত?
---আট।

পুলিশ সদস্য ফোনের ছবিটার দিকে একবার তাকালেন। তারপর বললেন,
---একটু অপেক্ষা করেন। হয়তো কোথাও গেছে, ফিরে আসবে।
নাসরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
---স্যার, ও কখনো আমাকে না বলে কোথাও যায় না।
---আপনারা আগে আত্মীয়স্বজনের বাসায় খোঁজ নেন।
রাফির বাবা এবার নিজেকে সামলে বললেন,
---স্যার, আমরা সব জায়গায় খুঁজেছি। আপনারা যদি একটু....
পুলিশ সদস্য কথাটার মাঝখানে থামিয়ে দিলেন,
---দেখুন, আমরা তো বসে নেই। আপনারা একটা লিখিত অভিযোগ দিয়ে যান।

সেই রাতেই অভিযোগ করা হলো। কাগজে রাফির নাম লেখা হলো, বয়স লেখা হলো, ঠিকানা লেখা হলো। কিন্তু একটা শিশুর নাম কাগজে লেখা আর তাকে খুঁজে পাওয়া, এই দুইয়ের মাঝখানে যে অন্ধকারটা তৈরি হয়েছিল, সেটার কোনো হিসাব সেই কাগজে ছিল না।

--------

রাত আরও গভীর হতে লাগল। পাড়ার মানুষজন বেরিয়ে এল। কেউ টর্চ হাতে গলিতে খুঁজল, কেউ পুকুরের ধারে গেল। কেউ মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিল। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাফির ছবি ছড়িয়ে দিল। এক ঘণ্টার মধ্যেই ছবিটা শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে গেল। কেউ লিখল, "দয়া করে শেয়ার করুন।" কেউ লিখল, "আল্লাহ শিশুটাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দিন।" কেউ লিখল, "দেশে এসব কী হচ্ছে!" সবাই চিন্তিত। সবাই রাফিকে খুঁজছে।

কিন্তু রাত যত বাড়ছিল, একটা প্রশ্ন তত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, এই শিশুটাকে খুঁজে বের করার দায়িত্বটা আসলে কার? শুধু তার বাবা-মায়ের? শুধু পাড়ার মানুষের? নাকি এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থারও, যেখানে একটি শিশু নিখোঁজ হলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত সমন্বিতভাবে তাকে খুঁজে বের করার ব্যবস্থা থাকার কথা।

--------

রাত তিনটার দিকে রাফির বাবা আবার থানায় ফোন করলেন।
---স্যার, কোনো খবর পাওয়া গেছে?
---না।
---কোনো ক্যামেরার ফুটেজ দেখেছেন?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর প্রশ্ন এল,
---কোন ক্যামেরা?
রাফীর বাবা করুণ স্বরে বললেন,
---রাস্তার মোড়ের দোকানের ক্যামেরা। আর স্কুলের সামনে একটা ক্যামেরা আছে।
---সকালে দেখা যাবে।
রাফির বাবা আর কিছু বললেন না। ফোনটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখলেন। সকাল, একটা শব্দ মাত্র। কিন্তু একজন বাবার কাছে রাত তিনটা থেকে সকাল পর্যন্ত সময়টা কখনো কখনো একটা জীবনের মতো দীর্ঘ।

ঘরের দিকে তাকালেন তিনি। নাসরিন তখনো জেগে। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। মেঝেতে বসে কোলে রাফির স্কুলব্যাগ। ব্যাগটা খুলে একে একে জিনিসগুলো বের করলেন তিনি। একটা খাতা, একটা পেন্সিল।
একটা রাবার, দুটো কলম, অর্ধেক খাওয়া বিস্কুট, আর একটা ছোট্ট চকলেটের খালি প্যাকেট। নাসরিন প্যাকেটটা হাতে নিলেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
---আজকে ও চকলেট খায় নি কেনো। তারপর হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমি ওকে বকিনি তো?
রাফির বাবা অসহায় মুখ নিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রাফির মা আবার বলে উঠলেন,
---আজ চকলেট খাওয়ার জন্য ওকে বকিনি তো?

তিনি জানতেন না কেন কথাটা বলছেন। কিন্তু সন্তান হারিয়ে গেলে মায়েরা অনেক সময় বর্তমানের মধ্যে থাকেন না। তারা বারবার ফিরে যান কয়েক ঘণ্টা আগের পৃথিবীতে। শেষবার কখন ছেলেকে দেখেছিলেন। শেষবার কী বলেছিলেন। ছেলেটা কী বলেছিল। আর কোথায় একটু বেশি সাবধান হওয়া যেত। তখন সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রশ্নটা নিজের কাছেই ফিরে আসে, আমি কি আরেকটু সাবধান হতে পারতাম?

--------

পরদিন সকালে রাফির ছবি আরও ছড়িয়ে পড়ল. টেলিভিশনের স্ক্রলে খবর এলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এলেন। কয়েকজন কর্মকর্তা এলেন।
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলা হলো,
---আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।
নাসরিন তখন কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি কারও বক্তব্য শুনছিলেন না। কোনো প্রতিশ্রুতিও সে চায় না। তিনি শুধু একটা কথাই বললেন,
---আমার ছেলে কোথায়?
কেউ উত্তর দিতে পারল না। এই প্রশ্নটা শুধু নাসরিনের ছিল না। এটা সেইসব মায়েদের প্রশ্ন, যারা সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। সেইসব বাবার প্রশ্ন, যারা সকালে কাজে বের হওয়ার সময় সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেন, "দুষ্টুমি করো একদম, ভালো করে থেকো।" এটা সেইসব পরিবারের প্রশ্ন, যারা নিজেদের অনেক স্বপ্ন সরিয়ে রেখে একটা শিশুর ভবিষ্যৎ তৈরি করার চেষ্টা করেন।

বিয়ের পর মানুষ ভাবে, সংসার মানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। তারপর সন্তান আসে। ঠিক তখনই সংসারের অর্থ বদলে যায়। একটা ছোট্ট মানুষকে ঘিরে দুজন মানুষের জীবন, স্বপ্ন, অভিমান, ক্লান্তি, সবকিছু নতুন অর্থ পায়। তখন প্রশ্নটা শুধু হওয়া উচিত নয়, কে সংসারের খরচ চালাবে? কে রান্না করবে? কে সন্তানকে পড়াবে? প্রশ্ন হওয়া উচিত আরও বড়, সন্তানকে নিরাপদে বড় করার দায়িত্বটা কার?

শুধু মায়ের? বাবার? নাকি দুজনেরই? একজন বাবা কি শুধু উপার্জন করলেই তার দায়িত্ব শেষ? একজন মা কি শুধু রান্না, পড়াশোনা আর ঘরের কাজ সামলালেই তার দায়িত্ব শেষ? নাকি বাবা-মা দুজনেরই সন্তানের নিরাপত্তার দিকে সমানভাবে নজর রাখার দায়িত্ব আছে? আর সমাজের? একটা শিশু রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা কি একবার থেমে জিজ্ঞেস করি, তুমি একা কেনো? কোথায় যাবে? নাকি পাশ দিয়ে চলে যাই?

কোনো শিশুকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেখলে আমরা কি বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি? নাকি সহজ একটা কথা বলে পাশ কাটিয়ে যাই, "এটা হয়ত অন্যের পারিবারিক সমস্যার ফল, আমরা কি করব।" কখনো কখনো এই একটি বাক্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে একটা শিশুর বিপদ।

-----------

তৃতীয় দিন সকালে খবরটা এলো। রাফিকে পাওয়া গেছে। কিন্তু যেভাবে তার পরিবার চেয়েছিল, সেভাবে নয়। শহরের প্রান্তের একটি নির্জন জায়গা থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। খবরটা শুনে নাসরিন প্রথমে কোনো কথা বলেননি। তিনি শুধু ছেলের ছবিটা হাতে নিয়ে বসে ছিলেন। ছবিতে রাফি হাসছিল, হাতে চকলেট। যে শিশুটি সেদিন মায়ের কাছে ফেরার তাড়ায় গলির ভেতর দিয়ে হাঁটছিল, সে আর কোনোদিন সেই দরজায় ফিরে আসবে না। ঘরের দেয়ালে তার স্কুলব্যাগটা তখনো ঝুলছিল। খাতার ভেতরে অর্ধেক লেখা একটা বাক্য, আমার বড় হয়ে পুলিশ হওয়ার ইচ্ছা….." বাকিটা আর লেখা হয়নি।

নাসরিন ছেলের স্কুলের পোশাকটা বের করে বিছানায় রাখলেন। অনেকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
---ওর ইউনিফর্মটা ধুয়ে দেব?
ঘরে থাকা মানুষগুলো কেউ উত্তর দিল না। নাসরিন আবার বললেন,
---কাল তো স্কুল আছে।
তারপর থেমে গেলেন। কিছুক্ষণ পর যেন কথাটার অর্থ নিজেই বুঝতে পারলেন। রাফির আর কোনোদিন স্কুলে যাওয়া হবে না। তিনি ইউনিফর্মটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরলেন। এবার আর কান্না থামল না। একজন মা তখন শুধু তার সন্তানের মৃত্যুর জন্য কাঁদেন না। তিনি কাঁদেন সেইসব ভবিষ্যতের জন্য, যেগুলো আর কোনোদিন আসবে না। যে জন্মদিন গুলো আর হবে না। যে পরীক্ষার ফল আর জানা হবে না। যে ভুলের জন্য বকা আর দেওয়া হবে না। যে একদিন বড় হয়ে নিজের পছন্দের মানুষটার কথা বাবা-মাকে বলার কথা ছিল, সেই দিনটাও আর আসবে না। একটা শিশুর মৃত্যু শুধু একটা জীবন থামিয়ে দেয় না। একটা পরিবারের অসংখ্য সম্ভাব্য ভবিষ্যৎও থামিয়ে দেয়।

-----------

রাফির মৃত্যুর পর পুরো এলাকায় শোক নেমে এল।কয়েকদিন সবাই ব্যস্ত হয়ে গেল। মিছিল হলো, মানববন্ধন হলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট হলো। অনেকে প্রতিবাদ করে বলল, "অপরাধীদের কঠিন শাস্তি চাই।" কেউ বলল, "প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।" কেউ বলল, "শিশুদের নিরাপত্তার জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।"

কিন্তু সময়ের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। কিছুদিন পর মানুষ আবার নিজের জীবনে ফিরে যায়। দোকান খোলে, স্কুলের ঘণ্টা বাজে, অফিস শুরু হয়, বাস রাস্তায় নামে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন খবর আসে। আর এই সব রাফিদের ছবিটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় হাজার হাজার নতুন ছবির নিচে। শুধু একজন মা ভুলতে পারেন না। তার কাছে সময় থেমে থাকে সেই সন্ধ্যাতেই। যেদিন দরজার ওপাশ থেকে ছেলেটা আর ফিরে আসেনি।

---------

রাফির বাবা একদিন থানার সামনে দাঁড়িয়ে একজন কর্মকর্তাকে বললেন,
---আমি কাউকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলতে আসিনি।
কর্মকর্তা চুপ করে শুনছিলেন।
---আমি জানতে চাই, আমার ছেলে যখন নিখোঁজ হয়েছিল, তখন প্রথম এক ঘণ্টায় কী কী করা হয়েছিল?
কেউ উত্তর দিল না। তিনি আবার বললেন,
---তখন কি কোন ক্যামেরার ফুটেজ দেখা হয়েছিল?
নীরবতা।
---তখন কোন কোন জায়গায় খোঁজা হয়েছিল?
নীরবতা।
---কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল?
আবারও নীরবতা।
রাফির বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
---আমার ছেলেকে তো আর ফেরত দিতে পারবেন না। কিন্তু পরের রাফিটাকে যেন ফেরাতে পারেন।

কথাটার মধ্যে কোনো বক্তৃতা ছিল না। কোনো স্লোগান ছিল না। ছিল শুধু একজন বাবার অসহায় প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাফির পরিবারের নয়, সমাজও রাষ্ট্রের কাছেও পাওনা। কারণ রাফির গল্প শুধু একটি শিশুর গল্প নয়। এটা নিরাপত্তার গল্প। এটা আমাদের চারপাশের ভয় গুলোর গল্প। একটা শিশু নিখোঁজ হয়।
কেউ অপহরণের শিকার হয়। কোনো নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন। কোনো মানুষ হত্যার শিকার হন। কোনো বৃদ্ধ মানুষ রাতে বাড়ি ফেরার সময় চারপাশে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে হাঁটেন। প্রতিটি ঘটনার পর কিছু দিন আমরা কথা বলি। ক্ষোভ প্রকাশ করি, বিচার চাই, তারপর সময় চলে যায়। নতুন ঘটনা আসে। পুরোনো খবরটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। কিন্তু ভয়টা থেকে যায়।
প্রশ্নটাও থেকে যায়, "আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে একজন মানুষ ঘর থেকে বের হলে অন্তত এই স্বাভাবিক বিশ্বাসটা রাখতে পারেন যে তিনি নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন?"

একটি ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে একজন বয়স্ক মানুষ, কেউই নিরাপদে চলাফেরার নিশ্চয়তাটুকু পুরোপুরি অনুভব করতে পারে না, এমন পরিস্থিতি আমাদের ভাবায়। একজন মানুষ ঘর থেকে বের হলে সে নিরাপদে আবার ঘরে ফিরবে, এই স্বাভাবিক নিশ্চয়তাটুকুও যদি অনিশ্চিত হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।

সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি যেন একই জায়গায় পড়ে না থাকে, এটা নিশ্চিত করা জরুরি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইন থাকা দরকার। আইনের কার্যকর প্রয়োগ দরকার।
দ্রুত তদন্ত দরকার। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা দরকার। ভুক্তভোগী পরিবারকে সহযোগিতা দরকার। অপরাধের বিচার দরকার। আর তার পাশাপাশি অপরাধ ঘটে যাওয়ার আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থাও দরকার। এসব কিছু না পাওয়ায় তাই প্রশ্নটা আবারও থেকেই যায়, "জননিরাপত্তা কি সত্যিই যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে?"

একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়? একটি পরিবার সাহায্যের জন্য থানায় গেলে তারা কত দ্রুত সহায়তা পায়? সংশ্লিষ্ট সংস্থা গুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা দ্রুত হয়? অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করাই কি যথেষ্ট? নাকি কোথায় কোথায় ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছিল, সেটাও খুঁজে দেখা দরকার? কারণ জবাবদিহি শুধু একজন অপরাধীর জন্য নয়। কখনো কখনো একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে আসে।

কিছু প্রশ্ন আবার আমাদের নিজেদের জন্যও। আমরা কি আমাদের সন্তানকে নিরাপত্তা সম্পর্কে শেখাই?
আমরা কি জানি সে কোথায় যায়? কার সঙ্গে যায়?
কোন পথে স্কুলে যায়? আমরা কি তার কথা মন দিয়ে শুনি? নাকি নিজেদের ব্যস্ততার মধ্যে তাকে শুধু বলে দিই, যাও, বাহিরে খেলো গিয়ে।"

আরেকটা প্রশ্ন পরিবারকে ঘিরে। বিয়ের পর কি শুধু একটা সংসার তৈরি করাই দায়িত্ব? নাকি সেই সংসারের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বও আমাদের? একজন বাবা কি শুধু উপার্জন করবেন?
একজন মা কি শুধু সন্তান সামলাবেন? নাকি সন্তানের নিরাপত্তা, তার বেড়ে ওঠা, তার ভয়, সবকিছুর দায়িত্ব দুজনেই ভাগ করে নেবেন?

আর সমাজ? একটা শিশু একা দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা কি একবার থামব? কেউ সাহায্য চাইলে আমরা কি শুনব? কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা দেখলে আমরা কি চুপ করে চলে যাব? নাকি ভাবব, এই শিশুটার নিরাপত্তার সঙ্গেও আমার একটা সম্পর্ক আছে।
কারণ সমাজ শুধু অনেকগুলো বাড়ির সমষ্টি নয়।
সমাজ মানে, একজন বিপদে পড়লে অন্যজনের পাশে দাঁড়ানো।

-------

রাফির বাবা সেই দিন গুলোর কথা ভুলতে পারেননি।
সন্ধ্যা হলেই তার চোখ চলে যেত গলির দিকে। কোনো শিশু দৌড়ে গেলে তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেন।
কোনো বাবা তার সন্তানকে হাত ধরে নিয়ে গেলে তিনি চুপ করে দেখতেন। তারপর হয়তো মনে মনে ভাবতেন, রাফিও তো এভাবেই হাঁটত। হাতে চকলেট থাকত।
বাড়ি ফেরার তাড়া থাকত। আর একটা মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন। শুধু সেই অপেক্ষাটা আর কোনোদিন শেষ হয়নি।

রাফির অসমাপ্ত খাতাটা অনেকদিন তার বাবার কাছে ছিল। একদিন তিনি খাতাটা খুললেন। সেই একই বাক্য, "আমার বড় হয়ে পুলিশ হওয়ার ইচ্ছা…..."
বাকিটা আর লেখা হয়নি। রাফির বাবা অনেকক্ষণ সেই পাতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে খাতাটা বন্ধ করলেন। হয়তো রাফি বড় হয়ে পুলিশ হতে পারেনি। কিন্তু তার অসমাপ্ত বাক্যটা যেন একটা প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেল, যে শিশুর স্বপ্ন ছিল একদিন মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করবে, তার নিজের নিরাপত্তা কে রক্ষা করবে? তাকে কেনো নিরাপত্তাহীনতার জন্য দুনিয়া ছাড়তে হলো?

রাফি ফিরে আসেনি। তার ঘরের দরজা আছে, স্কুলব্যাগ আছে, খাতা আছে, পেন্সিল আছে, কলম আছে, হয়তো কোনো এক কোণে এখনো পড়ে আছে তার চকলেটের খালি প্যাকেট। কিন্তু রাফি আর নেই।

একজন মা চাইলেও এই "নেই" শব্দটার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারেন না। কারণ কিছু শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। রাফির গল্প হয়তো এখানেই শেষ। কিন্তু প্রশ্নটা শেষ নয় কারণ আজ রাফি, কাল হয়তো অন্য কারও সন্তান।
আর কোনো মায়ের দরজায় সন্ধ্যা নামার পর যদি তার সন্তান আর ফিরে না আসে, তখন যেন তাকে শুধু একা দাঁড়িয়ে বলতে না হয়, "আমার ছেলেটাকে খুঁজে দিন।"
তার পাশে যেন পরিবার থাকে, সমাজ থাকে, প্রতিবেশী থাকে, প্রশাসন থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এমন একটি ব্যবস্থা থাকে যেখানে একজন নাগরিকের নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, তার অধিকার হয়। যেখানে একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবরকে "হয়তো ফিরে আসবে" বলে সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া না হয়। যেখানে অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শুধু শোক প্রকাশ নয়, তার আগেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে।
যেখানে একটি পরিবারের কান্না কয়েক দিনের খবর হয়ে হারিয়ে না যায়। কারণ একটি শিশু হারিয়ে যাওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা সময় শুধু কয়েক ঘণ্টা নয়। কখনো কখনো, সেই কয়েক ঘণ্টাই একটা জীবন আর একটা পরিবারের মধ্যকার শেষ দূরত্ব।

নিখোঁজ
সাবিহা ইসলাম লামিয়া
১৯/০৯/২০২৬

বাংলা সাহিত্যে কিছু নাম শুধু লেখক হিসেবে উচ্চারিত হয় না, একসময় তাঁরা হয়ে ওঠেন মানুষের অনুভূতিরই ভাষা। শরৎচন্দ্র তেমনই এক...
15/09/2026

বাংলা সাহিত্যে কিছু নাম শুধু লেখক হিসেবে উচ্চারিত হয় না, একসময় তাঁরা হয়ে ওঠেন মানুষের অনুভূতিরই ভাষা। শরৎচন্দ্র তেমনই একজন অমর কথাশিল্পী। তিনি শুধু গল্প বলেননি, মানুষের মনের গোপন দরজাগুলো খুলে দিয়ে তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, অভিমান, বেদনা, স্বপ্ন আর না বলা কথাগুলোকে শব্দে রূপ দিয়েছেন।

তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো কাগজের পাতায় জন্ম নিয়েও কখন যেন আমাদের খুব আপন হয়ে ওঠে। দেবদাসের হাহাকার ও অপূর্ণতা, পার্বতীর অভিমান ও দৃঢ়তা, শ্রীকান্তের অনিশ্চিত পথচলা, রাজলক্ষ্মীর গভীর টান, এসব চরিত্র শুধু কোনো উপন্যাসের মানুষ নয়। তারা আমাদের সমাজ, আমাদের চারপাশ এবং মানুষের জটিল মনোজগতেরই প্রতিচ্ছবি। তাদের সুখ-দুঃখ, অপেক্ষা, দ্বন্দ্ব আর হারিয়ে ফেলার বেদনার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই নিজেদেরই কোনো না কোনো অনুভূতির ছায়া।

শরৎচন্দ্রের লেখার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো তার ভাষার সরলতায়। খুব পরিচিত, সহজ কিছু শব্দের মধ্য দিয়েই তিনি এমন গভীর আবেগ প্রকাশ করেছেন, যা কখনো কখনো আমাদের নিজের অনুভূতিকেও নতুন করে চিনতে শেখায়। তার কোনো গল্প পড়তে পড়তে মনে হয়, এ তো আমাদেরই চেনা কোনো মানুষ। আবার কখনো মনে হয়, এ যেন জীবনেরই কোনো না বলা অধ্যায়।

দেবদাস থেকে শ্রীকান্ত, গৃহদাহ থেকে অসংখ্য ছোটগল্প। তার রচনায় বারবার ফিরে এসেছে মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন, সমাজের কঠোরতা, নারীর আত্মমর্যাদা, ভালোবাসার অপূর্ণতা এবং জীবনের নির্মম বাস্তবতা। এসবের মধ্য দিয়েই তার চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে জীবনের খুব কাছের মানুষ।

সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, প্রজন্মের জীবনযাপনও বদলে গেছে। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, অভিমান, অপেক্ষা, স্বপ্ন, বিচ্ছেদ কিংবা না-পাওয়ার অনুভূতিগুলো আজও একই রকম পরিচিত। আর সেখানেই শরৎচন্দ্রের সাহিত্য আজও এত জীবন্ত। তার লেখা আমাদের সময়ের বাইরে দাঁড়িয়েও আমাদের সঙ্গে কথা বলে।

একজন সত্যিকারের কথাশিল্পীর সার্থকতা বোধহয় এখানেই। তার সৃষ্টি কেবল তার সময়কে ধারণ করে না, পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়েও নিজের জন্য একটি জায়গা করে নেয়।

আজ সেই অমর কথাশিল্পীর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করছি। যিনি মানুষের গল্প লিখতে লিখতে মানুষের হৃদয়ের এত গভীরে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

শুভ জন্মদিন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আপনার কাহিনির শেষ হয়, কিন্তু আপনার সৃষ্টি, আপনার চরিত্র আর আপনার রেখে যাওয়া অনুভূতিগুলো থেকে যায় আমাদের ভেতরে, আজীবন।

~সাবিহা ইসলাম লামিয়া

14/09/2026

মানুষের জীবনের অদ্ভুত একটা ব্যাপার হলো, বড় কোনো ঘটনা ঘটার আগমুহূর্তে তা টেরই পাওয়া যায় না! জীবন তখন নিজের স্বাভাবিক ছন্দেই চলতে থাকে। সকালের চা ঠিক সময় মতো আসে, পরিচিত মানুষ গুলো প্রতিদিনের মতোই পরিচিত কথাগুলো বলে, রাস্তায় গাড়ির জ্যাম থাকে, অফিসে যাওয়ার তাড়া থাকে, মাসের শেষে টাকার হিসাব মেলাতে বসতে হয়। দিনগুলোও নিজের নিয়মে এগিয়ে যায়। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা থাকে না, কোনো পূর্বাভাসও থাকে না। অথচ এই একেবারে স্বাভাবিক দিনগুলোর আড়ালেই কখনো কখনো এমন কোনো ঘটনা নিঃশব্দে অপেক্ষা করে থাকে, যা একসময় মানুষের পুরো জীবনটাকেই বদলে দেয়। পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেদিনই বুঝি সবকিছুর শুরু হয়েছিল। সেদিনই? কিন্তু সেদিনটাকে তো আর দশটা দিনের মতোই সাধারণ মনে হয়েছিলো।

ইহানের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই হয়েছিলো। ইহান ঘুম থেকে উঠেছিল আটটা সতেরো মিনিটে। তার ঘুম ভাঙার কথা ছিল সাতটায়। সাতটা বাজলেই তার অ্যালার্ম বেজে ওঠে। অ্যালার্মের নাম সে দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ। কারণ অ্যালার্মের শব্দ হিসেবে রবীন্দ্রসংগীত দেওয়া আছে। রবীন্দ্রনাথের গান শুনে ঘুম থেকে ওঠা তার কাছে বেশ ভদ্র ব্যাপার মনে হয়। কিন্তু গত তিন দিন ধরে রবীন্দ্রনাথ গান গেয়ে গেয়ে অ্যালার্ম বন্ধ করে দিচ্ছেন, আর ইহান ঘুমিয়ে থাকছে। আজও তাই হলো।

আটটা সতেরো মিনিটে ঘুম ভেঙে প্রথমেই তার মনে হলো, পৃথিবীটা খুব অন্যায় জায়গা। সে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পাশ ফিরে বলল, আজ অফিসে যাব না। কেউ উত্তর দিল না। ইহান আবার বলল, সত্যিই যাব না। এবারও কেউ উত্তর দিল না। সে নিজেই একটু পর বলল, কিন্তু গেলে বেতনটা আসবে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে উঠে গেল।

ইহানের বয়স আটাশ। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষকের চাকরি করে। বেতন খুব বেশি নয়। মাসের শেষ সপ্তাহে তার মানিব্যাগ এমন শুকিয়ে যায় যে মানিব্যাগটাকে দেখলে মনে হয়, ভেতরে টাকা না থাকার জন্য সেটিও লজ্জিত। সে থাকে মিরপুরের একটি পুরোনো তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায়। বাড়িটা তার বাবার। বাড়িতে মোট চারজন মানুষ। ইহান, তার বাবা, তার মা এবং তার ছোট বোন ইরা। ইরার বয়স সবে উনিশ, সে কলেজে পড়ে এবং পৃথিবীর সব বিষয়ে তার মতামত আছে। বিশেষ করে ইহানের বিয়ে নিয়ে।

ইহান বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখল, ইরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ইরার হাতে চায়ের কাপ।

তুই এত সকালে উঠেছিস?
ইরা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, সকাল?
ইহান কিছু বলল না।
ইরা বলল, এগারোটা বাজতে আর বেশি দেরি নেই। ইহান অবাক হয়ে বলল, এগারোটা!
ইরা বলল, না। সাড়ে আটটা, মিথ্যা বললাম।
ইহান কিছুক্ষণ বোনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুই একদিন খুব বিপদে পড়বি। ইরা হাসল।
আমি ছোটবেলা থেকেই বিপদে আছি। তোমার মতো ভাই আছে আমার।
ইহান চায়ের কাপটা নিয়ে বলল, মা কোথায়?
রান্নাঘরে।
বাবা?
বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে।
ইহান চায়ে চুমুক দিল।
চা ভালো হয়েছে।
ইরা বলল, আমি বানাইনি।
তাহলে?
মা বানিয়েছে।
তাহলে তুই আমাকে কেন দিলি?
ইরা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, মা বলেছে তুমি উঠলে দিয়ে দিতে। ইহান চুপ করে গেল।

এই বাড়িতে মায়ের একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। তিনি ইহানকে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু কখনো সরাসরি বলেন না। ইহান অফিসে যাওয়ার সময় তার ব্যাগে একটা আপেল পাওয়া যায়, সে জানে আপেলটা কে রেখেছে। বৃষ্টির দিনে ছাতা পাওয়া যায়, সে জানে ছাতাটা কে রেখেছে। জ্বর হলে মাথার কাছে পানি রাখা থাকে, সে জানে পানি কে রেখেছে। কিন্তু মা কখনো বলেন না, তোকে ভালোবাসি।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মায়ের মতোই তিনি মনে করেন, ভালোবাসার কথা মুখে বলতে হয় না। রান্না করে খাওয়ালেই যথেষ্ট।

ইহান চা শেষ করে রান্নাঘরের দিকে গেল। মা ভাতের হাঁড়ি নামাচ্ছিলেন।
মা।
হুম।
আজ অফিসে যাব না।
কেন?
শরীর খারাপ।
মা তাকালেন না। কাল রাতে তোর রুমে এক পাতা জ্বরের ওষুধ রেখেছি, খেয়ে নিস।
আমার জ্বর নেই।
তাহলে অফিসে যা।
ইহান বুঝল, এই যুদ্ধে তার জয় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সে বলল, যাচ্ছি। মা এবার তাকালেন।
সকালে কিছু খেয়ে যাস।
ইহান একটু হেসে বলল, আচ্ছা।
এই আচ্ছা শব্দটার মধ্যে অনেক কিছু থাকে। কখনো সম্মতি। কখনো বিরক্তি। কখনো ভালোবাসা। আবার কখনো এমন কিছু থাকে যার কোনো নাম নেই।

ইহান নাশতা করে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি শুরু হলো।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবা বললেন, ছাতা নে।
ইহান বলল, আছে।
বাবা বললেন, কোথায়?
ইহান নিজের হাতে থাকা ছাতার দিকে তাকাল, আছে তো।
বাবা বললেন, ওটা ভাঙা।
ইহান ছাতাটা খুলল, সত্যিই ভাঙা। সে বাবার দিকে তাকাল। বাবা খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বললেন, নতুন একটা ছাতা কিনে আনিস।
ইহান বলল, টাকা নেই।
বাবা খবরের কাগজ নামালেন। তারপর পকেট থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে দিলেন।
ইহান টাকা নিতে নিতে বলল, পরে দিয়ে দেব।
বাবা বললেন, জানি।
ইহান দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
বাবা তখনও খবরের কাগজ পড়ছেন। ইহান হঠাৎ বলল, বাবা।
হুম?
কিছু না।
বাবা চোখ তুলে তাকালেন।
কিছু বলবি?
ইহান মাথা নাড়ল, না। তারপর সে বেরিয়ে গেল।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তার মনে হলো, বাবা তাকে পাঁচশ টাকা দিলেন কেন? তার তো নিজেরও খুব বেশি টাকা থাকার কথা নয়। এই প্রশ্নটা তার মাথায় বেশিক্ষণ থাকল না। কারণ গেটের বাইরে এসে সে মেয়েটাকে দেখল। মেয়েটা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে কোনো ছাতা নেই। চুল ভিজে কপালের সঙ্গে লেগে আছে। পরনে নীল রঙের সালোয়ার কামিজ। মেয়েটা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
ইহান কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর বুঝল, মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা বলল, আপনি কি এই বাড়িতে থাকেন?
ইহান বলল, জি।
আপনার নাম ইহান?
ইহানের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো সে অবাক হয়ে আবারও বলল, জি। কিন্তু আপনি কে?
মেয়েটা একটু হাসল, অদ্ভুত শান্ত হাসি। আমি মায়া। ইহান কিছু বলল না।
মায়া বলল, আপনার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।
কী কথা?
এখন বলব না।
কেন?
আপনি এখন অফিসে যাবেন।
হ্যাঁ।
আপনি আজ অফিসে যাবেন না।
ইহান অবাক হয়ে বলল, কেন?
মায়া বলল, কারণ আজ আপনার একটা বিপদ হবে।
ইহান কিছুক্ষণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর হেসে ফেলল।
আপনি কি জ্যোতিষী?
মায়া মাথা নাড়ল, না।
তাহলে?
আমি শুধু জানি।
কীভাবে জানেন?
মায়া কোনো উত্তর দিল না। সে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল। ইহান ডাকল, শুনুন। মায়া থামল না।
ইহান আবার ডাকল। মায়া এবার পেছনে ফিরে তাকাল। বৃষ্টির পর্দার ভেতর দিয়ে মেয়েটাকে খুব অদ্ভুত লাগছিল। সে বলল, আজ সন্ধ্যার আগে আপনি আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলবেন।
ইহান বলল, কেন?
মায়া বলল, কারণ আপনার বাবা আপনাকে এমন একটা কথা বলবেন, যেটা আপনি বিশ্বাস করবেন না।
তারপর সে চলে গেল।

ইহান অনেকক্ষণ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই ছাতাটা খুলল, ভাঙা ছাতা। বৃষ্টির পানি মাথায় পড়তে লাগল। সে তবুও দাঁড়িয়ে রইল। কিছু কিছু দিন মানুষের জীবনে আসে খুব সাধারণ পোশাকে। সেদিনের মতো, সকালটা ছিল বৃষ্টির। মায়ের বানানো চা ছিল। বাবা পাঁচশ টাকা দিয়েছিলেন। বোন মিথ্যা বলেছিল। সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। শুধু গেটের সামনে নীল জামা পরা মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল। আর সে জানত না, সেই মেয়েটিই তার জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক দিনটাকে শেষ করে দিয়েছে।

চলবে....

#মেঘের_খেয়ায়_ভেসে
সাবিহা ইসলাম লামিয়া
পর্ব: ১

ডেইজ অ্যাট দ্য মরিসাকি বুকশপলেখক: সাতোশি ইয়াগিসাওয়াপার্সোনাল রেটিং: ৯/১০কিছু বই পড়ার পর মনে হয়, একটা গল্প শেষ করলাম। আ...
11/09/2026

ডেইজ অ্যাট দ্য মরিসাকি বুকশপ
লেখক: সাতোশি ইয়াগিসাওয়া
পার্সোনাল রেটিং: ৯/১০

কিছু বই পড়ার পর মনে হয়, একটা গল্প শেষ করলাম। আবার কিছু বই আছে, যেগুলো শেষ করার পরও মন থেকে শেষ হয় না। শুধু লেখাগুলো শেষ হয়ে যায়, বইয়ের শেষ পাতাটা বন্ধ করা হয়। ডেইজ অ্যাট দ্য মরিসাকি বুকশপ আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি বই।

বইটা পড়া শেষ করার পর বেশ কিছুক্ষণ বইটা হাতেই নিয়ে বসেছিলাম। এমন না যে গল্পটা খুব বড় কোনো ধাক্কা দিয়েছে, কিংবা শেষটায় এমন কোনো চমক ছিল যা আমাকে অবাক করে দিয়েছে। বরং উল্টো, বইটা খুব শান্তভাবে আমার ভেতরে ঢুকে গেছে। শেষ পৃষ্ঠা বন্ধ করার পরও মনে হচ্ছিল, আমি যেন এখনো সেই ছোট্ট বইয়ের দোকানটার ভেতরেই বসে আছি।

টোকিওর জিম্বোচোর বইপাড়ার ছোট্ট মরিসাকি বুকশপকে ঘিরে এগিয়ে যায় গল্প। প্রথমদিকে বইটির গতি খুব ধীর মনে হতে পারে, কিন্তু একটু এগোলেই বোঝা যায়, এই ধীরতাটাই আসলে বইটির সৌন্দর্য। এটা শুধু একটা বইয়ের দোকানের গল্প নয়। এর ভেতরে আছে মানুষের একাকিত্ব, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, পুরোনো কষ্ট, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আবার নতুন করে জীবনের দিকে ফিরে তাকানোর গল্প। বইটা একই সঙ্গে নিজের জীবনকে নতুন করে আবিষ্কার করার এবং ভেঙে পড়ার পর আবার শুরু করার সাহস খুঁজে পাওয়ার গল্প। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকেই যে নতুন একটা অধ্যায়ের শুরু হতে পারে, বইটি খুব নরমভাবে সেই কথাটাই মনে করিয়ে দেয়।

তাকাকো যখন হঠাৎ করে নিজের পরিচিত জীবন থেকে ছিটকে পড়ে, তখন তার সামনে খুলে যায় মরিসাকি বুকশপের দরজা। সেই ছোট্ট বইয়ের দোকান, চারপাশের বই আর কিছু অদ্ভুত অথচ আন্তরিক মানুষ ধীরে ধীরে তার পৃথিবীটাকে বদলে দিতে শুরু করে। লেখক খুব স্বাভাবিকভাবেই দেখিয়েছেন, একজন মানুষ কীভাবে নিজের পরিচিত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে নিজের মধ্যেই হারিয়ে যেতে পারে এবং ছোট ছোট অভিজ্ঞতা, মানুষের আন্তরিকতা ও বইয়ের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের কাছে ফিরে আসতে পারে।

আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে বইটির আবহ। জাপানের ছোট্ট বইপাড়া, পুরোনো বইয়ের গন্ধ, নিরিবিলি দিন আর মানুষের ছোট ছোট অনুভূতিগুলো মিলিয়ে পুরো গল্পটাকে খুব শান্ত একটা অনুভূতি দেয়। পড়ার সময় মনে হয়, আমিও যেন সেই ছোট্ট বইয়ের দোকানের কোনো এক কোণে বসে আছি, টেবিলে এক কাপ চা, বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছে আর চারপাশে শুধু বইয়ের গন্ধ। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, আমিও যদি এমন কোনো বইপাড়ায় গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে বেড়াতে পারতাম!

কখনো কখনো আমাদের জীবনে এমন একটা জায়গারই প্রয়োজন হয়, যেখানে আমাদের কিছু প্রমাণ করতে হবে না, কাউকে খুশি করার চেষ্টা করতে হবে না, শুধু নিজের মতো করে কিছুক্ষণ থাকা যাবে। আমার কাছে মরিসাকি বুকশপ ঠিক তেমনই একটি আশ্রয়। এমন একটা জায়গা, যেখানে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া জরুরি নয়, যেখানে নিজের ক্লান্তি নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকাও যথেষ্ট।

বইটা পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে, মানুষকে সবসময় বড় কোনো ঘটনা বদলে দেয় না। কখনো একটা বই, একটা আলাপ, একটা নতুন পরিচয় কিংবা কারও খুব সাধারণ একটা আন্তরিকতাই যথেষ্ট হয়। তাকাকোর পরিবর্তনটাও তাই আমার খুব ভালো লেগেছে। সে একদিনে বদলে যায়নি, তার জীবনও হঠাৎ সুন্দর হয়ে যায়নি। বরং খুব ধীরে ধীরে সে নিজের চারপাশের পৃথিবীটাকে আবার দেখতে শুরু করেছে। কোনো একটা সকালে ঘুম থেকে উঠে সব কষ্ট হঠাৎ চলে যায় না। বরং একদিন দেখা যায়, যে মানুষটা এতদিন জানালার দিকে তাকাত না, সে আবার বাইরে তাকাতে শুরু করেছে।

বইটার সবচেয়ে সুন্দর দিক আমার কাছে এর নীরবতা। সব গল্পকে যে উচ্চস্বরে বলতে হয় না, সেটা এই বইটা পড়তে পড়তে খুব ভালোভাবে অনুভব করেছি। অনেক অনুভূতি সরাসরি বলা হয়নি, কিন্তু তবুও সেগুলো অনুভব করা যায়। কোনো একটা ছোট্ট দৃশ্য, কারও বলা সামান্য একটা কথা কিংবা বইয়ের দোকানের নিঃশব্দ পরিবেশের মধ্যেই যেন অনেক বড় কিছু লুকিয়ে থাকে। বইটি জোর করে আবেগী হতে চায়নি, কষ্টকে অতিরঞ্জিত করেনি। জীবনের মতোই সবকিছু এসেছে খুব স্বাভাবিকভাবে।

আর বইয়ের প্রতি ভালোবাসাটা বইটাকে আমার কাছে আরও আপন করে তুলেছে। যারা বই পড়তে ভালোবাসেন, তারা জানেন, একটা বই কখনো কখনো শুধু বই থাকে না। কখনো আশ্রয়, কখনো সঙ্গী, কখনো নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের একটা মাধ্যম হয়ে ওঠে। কোনো এক অচেনা লেখকের লেখা কয়েকটি বাক্য কখনো কখনো এমন জায়গায় গিয়ে হাত রাখে, যেখানে আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষও পৌঁছাতে পারে না। এই বইটা সেই অনুভূতিটাকে খুব সুন্দরভাবে ধরতে পেরেছে।

তবে বইটি পড়ার আগে একটা বিষয় মাথায় রাখা ভালো, এটা দ্রুতগতির গল্প নয়। এখানে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা নেই, বড় কোনো চমক দিয়ে পাঠককে আটকে রাখার চেষ্টা নেই। যারা খুব দ্রুতগতির গল্প, একের পর এক ঘটনা কিংবা তীব্র রহস্য খুঁজছেন, তাদের কাছে বইটা কিছুটা ধীর মনে হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয়, এই বইটাকে তাড়াহুড়ো করে পড়ার বইই না। এটা একটু থেমে পড়ার বই, একটু চুপচাপ পড়ার বই, নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের মতো পড়ার বই।

আর সবচেয়ে ভালো লেগেছে, বইটা আমাকে কোনো বড় শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। কোনো উপদেশ দিয়ে বোঝাতে চায়নি কীভাবে জীবন কাটাতে হবে। বরং গল্পের ভেতর দিয়ে খুব নরমভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে, জীবন এলোমেলো হয়ে গেলে সেখান থেকে আবার শুরু করা যায়। কিছু মানুষ আমাদের ছেড়ে যায়, কিছু সম্পর্ক ভেঙে যায়, কিছু স্বপ্ন পূরণ হয় না। কিন্তু একটা অধ্যায় শেষ হয়ে যাওয়া মানেই পুরো বইটা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। হয়তো সামনে আরও একটা অধ্যায় অপেক্ষা করে থাকে।

বইটা শেষ করার পর আমার সবচেয়ে বেশি যে অনুভূতিটা হয়েছে, সেটা হলো শান্তি। খুব ভারী কোনো গল্প নয়, খুব চমকপ্রদ কোনো কাহিনিও নয়। বরং ধীরে ধীরে মনকে ছুঁয়ে যাওয়া এক টুকরো জীবন। বইটা শেষ করে তাই মনে হয়নি, একটা গল্প শেষ করলাম। মনে হয়েছে, খুব শান্ত একটা বিকেল শেষ হলো। বুকশেলফ থেকে বইটা নামিয়ে রাখার পরও তার গন্ধটা যেন কিছুক্ষণ হাতে লেগে রইল।

"ডেইজ অ্যাট দ্য মরিসাকি বুকশপ" বইটা আমার কাছে অনেকটা এক কাপ উষ্ণ কফির মতো, খুব জটিল কিছু নয়, কিন্তু মন খারাপের দিনে পাশে বসে থাকা একজন নীরব বন্ধুর মতো।

যারা ধীরগতির, শান্ত, বইকেন্দ্রিক এবং মন ভালো করে দেওয়ার মতো গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য বইটি বেশ সুন্দর একটি পাঠ হতে পারে। কিছু বই পড়তে হয় গল্প জানার জন্য। আর কিছু বই পড়তে হয় নিজের ভেতরের কোনো নীরব জায়গাকে একটু আলো দেখানোর জন্য।

কিছু বই গল্প শোনায়। কিছু বই আমাদের থামতে শেখায়। আর কিছু বই শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের ভেতরে থেকে যায়। "ডেইজ অ্যাট দ্য মরিসাকি বুকশপ" আমার কাছে ঠিক সেই ধরনের বই।
এটা নিজের কাছে ফিরে আসার গল্প। বইয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার গল্প। মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার গল্প। ধীরে ধীরে জীবনের কাছেও ফিরে যাওয়ার গল্প।

সব বই আমাদের জীবনে ঝড় তোলে না। কিছু বই শুধু খুব নরমভাবে জানালাটা খুলে দেয়, তারপর ঘরের ভেতর একটু আলো ঢোকে। আর কখনো কখনো সেই আলোর নাম হয়, একটা বই।

বইটা শেষ হয়েছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া অনুভূতিটা এখনো শেষ হয়নি।

~সাবিহা ইসলাম লামিয়া

বই বৃক্ষের আলিঙ্গন 🖤
08/09/2026

বই বৃক্ষের আলিঙ্গন 🖤

I still mourn the future that never got to happen.
08/09/2026

I still mourn the future that never got to happen.

𝖲𝗈𝗆𝖾𝗍𝗂𝗆𝖾𝗌, 𝗍𝗁𝖾 𝖽𝗎𝗇𝗒𝖺 𝖿𝖾𝖾𝗅𝗌 𝗍𝗈 𝗁𝖾𝖺𝗏𝗒 𝗍𝗈 𝖻𝖾𝖺𝗋.
05/09/2026

𝖲𝗈𝗆𝖾𝗍𝗂𝗆𝖾𝗌, 𝗍𝗁𝖾 𝖽𝗎𝗇𝗒𝖺 𝖿𝖾𝖾𝗅𝗌 𝗍𝗈 𝗁𝖾𝖺𝗏𝗒 𝗍𝗈 𝖻𝖾𝖺𝗋.

05/09/2026

#অন্ধকারের_ওপারে
সাবিহা ইসলাম লামিয়া
পর্ব ৭:

আমার মা। আরিয়ানের কণ্ঠটা এতটাই নিচু ছিল যে মেহরিন প্রথমে ঠিক বুঝতে পারল না। তারপর ছবিটা আবার দেখল। ছবিতে সত্যিই একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। মুখটা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। কিন্তু আরিয়ান যেভাবে তাকিয়ে আছে, তাতে মেহরিন বুঝতে পারল, এটা তার কাছে শুধু একটা ছবি নয়। এটা আঠারো বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা একটা প্রশ্ন।

মেহরিন ধীরে বলল, স্যার, আপনি নিশ্চিত?
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে ছবিটা ফোনে জুম করে দেখল। মহিলার পরনে সেই একই শাড়ি, যেটা তার মা মৃত্যুর আগের দিন পরেছিলেন। তার গলায় সেই রুপার লকেট। আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়, ছবির ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা বারবার ছবির দিকে তাকাচ্ছে, রাফি, আর তার পাশে আদনানের ব্যবসায়িক সহযোগী, কামরান চৌধুরী।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে কামরানকে ফোন দিল। একবার, দুইবার, কোনো উত্তর নেই। তারপর একটা মেসেজ এল।

আরিয়ান বলল আজ অফিসে আসব না। জরুরি কাজে বাইরে আছি। আরিয়ান ফোনটা নামিয়ে রাখল। মেহরিন বলল, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
--- কামরানের কাছে।
---আমি যাব আপনার সঙ্গে।
---না।
---কেন?
---কারণ তুমি এখন টার্গেট। মেহরিন শান্ত গলায় বলল,
আপনিও তো টার্গেট। আরিয়ান তার দিকে তাকাল।
মেহরিন এবার একটু হেসে বলল, তাহলে দুজন একসঙ্গে থাকলে অন্তত একজন আরেকজনকে সতর্ক করতে পারব।

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ফাইন, কাম উইথ মি।

-----------

দুপুরের কিছু পর। শহরের বাইরে কামরান চৌধুরীর ব্যক্তিগত অফিসে পৌঁছাল আরিয়ান ও মেহরিন।
অফিসটা অস্বাভাবিকভাবে নীরব। সামনে রিসেপশনে কেউ নেই। আরিয়ান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
---কামরান! কোনো উত্তর নেই। মেহরিন চারপাশে তাকিয়ে বলল, এখানে কেউ নেই মনে হচ্ছে। আরিয়ান ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। একটা কেবিনের দরজা আধখোলা। সে দরজা ঠেলে খুলল।
কামরান চেয়ারে বসে আছেন। চোখ বন্ধ, টেবিলের ওপর একটা কাপ, আর তার পাশে একটা খাম।
মেহরিন হঠাৎ থেমে গেল। লোকটা কি...

আরিয়ান দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল।
কামরান নড়লেন না। আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড পরীক্ষা করে বুঝল, তিনি অজ্ঞান। মেহরিন ভয়ে বলল, স্যার!

---অ্যাম্বুলেন্স কল করো। মেহরিন ফোন বের করল।
আরিয়ান খামটা হাতে তুলে নিল। খামের ওপর লেখা,
আরিয়ানের জন্য। সে খাম খুলল। ভেতরে একটা ছোট কাগজ। "আমি তোমার মায়ের মৃত্যুর সত্য জানি। কিন্তু সব বলতে পারিনি। কারণ যে মানুষটাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো, সে-ই তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু।"

আরিয়ান কাগজটা পড়েই থেমে গেল। মেহরিন বলল,
কী লেখা? আরিয়ান কাগজটা তার হাতে দিল। মেহরিন পড়ল। তারপর বলল, আপনার বাবা? আরিয়ান উত্তর দিল না। তার চোখ তখন টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটা ছোট ছবিতে। ছবিতে তার মা। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মেহরিনের বাবা। কিন্তু এবার ছবির পেছনে আরেকজন আদনান খান। তিনজনই একসঙ্গে।

মেহরিন ছবিটা দেখে হতবাক।
--- আমার বাবা আপনার মায়ের সঙ্গে কাজ করতেন? ---মনে হচ্ছে।
---কী নিয়ে?
---জানি না।

হঠাৎ কামরান কেঁপে উঠলেন। আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল। কামরান চোখ খুললেন। তার চোখে ভয়। আরিয়ান ঝুঁকে বলল, মিস্টার কামরান, কে আপনাকে আক্রমণ করেছে? কামরান কথা বলতে পারছিলেন না। কয়েক সেকেন্ড পর খুব কষ্ট করে বললেন, ওরা...
---কারা?

কামরানের চোখ দরজার দিকে গেল। তারপর ফিসফিস করে বললেন, খান বাড়ির...

আরিয়ান থমকে গেল।
---কে?
--- কামরান আবার বললেন, ঘরের মানুষ...

তারপর চোখ বন্ধ করে ফেললেন। মেহরিন বলল,
স্যার, উনি আবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। আরিয়ান বললো দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করো। কিন্তু তার মাথায় এখন শুধু একটা কথাই ঘুরছে। খান বাড়ির ঘরের মানুষ।

--------

সন্ধ্যা।

হাসপাতালের করিডোরে বসে আছে আরিয়ান ও মেহরিন। ডাক্তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। আপনি রোগীর আত্মীয়? আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।
---জি।
---উনি এখন স্থিতিশীল। তবে বেশ কিছুক্ষণ জ্ঞান থাকবে না।
---থ্যাংক ইউ, ডাক্তার।

ডাক্তার চলে গেলে মেহরিন ধীরে বলল, আপনি কি আপনার বাবাকে সন্দেহ করছেন? আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, আমি কাউকে সন্দেহ করতে চাই না।
কিন্তু এখন সবাইকে করতে হচ্ছে। মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে রইল। আপনি জানেন, আপনার মায়ের মৃত্যুর রহস্যের সঙ্গে আমার বাবাও জড়িত। আরিয়ান বলল, হ্যাঁ।
---আপনি আমাকে সন্দেহ করেন?
---না।
---এত সহজে বিশ্বাস করছেন?
---না। মেহরিন অবাক। আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই। কথাটা শুনে মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, কেন?

আরিয়ান উত্তর দেওয়ার আগে হাসপাতালের করিডোরের শেষ মাথায় একজনকে দেখতে পেল।
একজন বৃদ্ধা, সাদা পোশাক, হাতে লাঠি, আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।

মহিলাটা তাকে দেখেই দ্রুত ঘুরে চলে গেলেন। আরিয়ান তার পেছনে ছুটল, মেহরিনও পেছনে গেল।
করিডোরের শেষ প্রান্তে গিয়ে আরিয়ান দেখল, বৃদ্ধা লিফটে ঢুকে পড়েছেন। দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগে বৃদ্ধা তার দিকে তাকালেন।

আরিয়ান থমকে গেল, চোখ দুটো! এই চোখ সে চেনে।
তার মায়ের চোখের মতন। লিফট নেমে গেল। আরিয়ান স্থির দাঁড়িয়ে রইল। মেহরিন এসে পাশে দাঁড়াল।
---কী হয়েছে?
আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, ওই মহিলার চোখ...

তারপর সে হঠাৎ পকেট থেকে মায়ের পুরোনো ছবিটা বের করল। ছবির দিকে তাকিয়ে তার হাত কেঁপে উঠল। কারণ ছবির পেছনে থাকা মহিলাটার চোখও একই রকম।

আর ছবির নিচে এতদিন যে লেখা সে খেয়াল করেনি, আজ প্রথমবার সেটা পরিষ্কার দেখা গেল। "যদি আমি মারা যাই, তাকে খুঁজে বের করো।" সে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আরিয়ানের মুখ শুকিয়ে গেল।

মেহরিন ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, কে তিনি?
আরিয়ান ধীরে উত্তর দিল, আমি জানি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আমার মা হয়তো একা মারা যাননি।

ঠিক তখনই মেহরিনের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল। সে কল ধরতেই ওপাশ থেকে একজন মহিলা খুব নিচু গলায় বললেন, মেহরিন, আরিয়ানকে নিয়ে এখনই হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যাও।

মেহরিন কেঁপে উঠল।
---আপনি কে? ওপাশ থেকে উত্তর এল, যার ছবি তোমরা হাতে ধরে আছ, আমি সেই মানুষটার সবচেয়ে কাছের মানুষ।

কল কেটে গেল। মেহরিন ধীরে ফোনটা নামিয়ে আনল।
আরিয়ান তার দিকে তাকাল।
---কে ফোন করেছিল? মেহরিন উত্তর দেওয়ার আগেই হাসপাতালের করিডোরের আলো নিভে গেল।
তারপর অন্ধকারের মধ্যে একটা গুলির শব্দ শোনা গেল।

#চলবে.....

Address

Mymensingh
Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when স্বপ্নবুনন - Swapnobunon posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share