09/11/2025
পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম এক কারাগারের কথা লিখতে বসেছি। যার নাম Tadmor Prison, স্থানীয়দের ভাষায় “Tadmur.”
আমার লেখা যারা নিয়মিত পড়েন, তারা বেশিরভাগই ছোটগল্পের পাঠক। তবে মাঝে মাঝেই ইতিহাস নির্ভর কিছু লেখা নিয়ে আমি কাজ করি। কারন ইতিহাসের ছাত্রী হিসেবে, এই বিষয়টির প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে।
এছাড়া গল্পের প্রয়োজনে বিভিন্ন বিষয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে, এমন অনেক কিছু খুঁজে পাই যা আমাকে নাড়া দেয়। সেইসব বিষয়গুলো নিয়ে লিখলে, একধরনের মানসিক তৃপ্তি পাই।
Tadmor Military Prison এর উপর লিখতে গিয়ে ইউটিউবের অনেকগুলো ভিডিও দেখলাম, সিরিয়ান পোর্টালের। বিবিসির দেয়া তথ্য এবং এই কারাগারের উপর নির্মিত একমাত্র ডকুমেন্টারি( Tadmor (২০১৬) – Monika Borgmann ও Lokman Slim), সেই সাথে চ্যাট জিপিটি থেকে পাওয়া তথ্য... সব একসঙ্গে মিলিয়ে লেখাটি তৈরি করছি। এটি তৈরি করতে তিনদিনের বেশি সময় লেগেছে তাই, লেখাটি কেমন লেগেছে জানাতে পারেন আমাকে।
সিরিয়ার প্রাচীন শহর Palmira (Palmyra)-র কাছে, মরুভূমির এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল Tadmor Military Prison। ছিল বলার কারণ বর্তমানে এই জেলখানাটি আর নেই, রয়েছে কেবল এর ধ্বংসাবশেষ
বাইরে থেকে সাধারণ এক স্থাপনা মনে হলেও, এর ভেতরে নরকের মতো একটি দুনিয়া ছিল ।এখানেই ঘটেছিল ইতিহাসের নারকীয় “The Tadmor Massacre.”
এই জেলখানাকে বলা হয়—
“The most oppressive place on Earth.”
ইতিহাস ঘেঁটে যা পেলাম তা হলো, ১৯৫৮ সালে ব্রিটিশদের বানানো একটি পুরনো সামরিক ঘাঁটিকে ১৯৬৬ সালে সিরিয়ার সরকার Tadmor Prison এ রূপ দেয় ।
যদিও এর ভয়ঙ্কর অধ্যায় শুরু হয় Hafez al-Assad ক্ষমতায় আসার পর (১৯৭০-এর দশকে)।
এরপর এটা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বন্দিদের নরক, হাফেজ আল-আসাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কবরস্থান।
শুধুমাত্র সিরিয়ান নয়, বিদেশিরাও বন্দি ছিল এই কারাগারে।
যারাই সরকারের বিরোধিতা করত, এখানে পাঠানো হতো।
একজন প্রাক্তন বন্দির ভাষ্যমতে ,
“Tadmor was not a prison; it was a place where time and mercy died together.”
Tadmor-এর নিয়ম ছিল ,
বন্দিরা কখনো প্রহরীর চোখে চোখ রাখতে পারত না।
কথা বলা নিষিদ্ধ।
ঘুমানোর সময়ও মারধর হতো, যেন ঘুমও শাস্তির অংশ হয়।
জেলখানার ভেতরে মেঝে রক্তে পিচ্ছিল হয়ে থাকত।
একজন বেঁচে ফেরা বন্দি লিখেছেন ,
“ওখানে কাঁদতে পারা ছিল সৌভাগ্য।
কারন সকলেরই চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিল।"
বন্দিদের অনেককেই নির্যাতনের পর সপ্তাহের পর সপ্তাহ একা রাখা হতো,
অন্ধকার ঘরে, আলোবাতাসহীন অবস্থায়।
কেউ মারা গেলে, লাশ টেনে নিয়ে যাওয়া হতো—
কিন্তু কেউ জানত না, কোথায় সমাধিস্থ করা হচ্ছে।
Tadmor Military Prison এর জীবনটা ছিল মাইনফিল্ডে হাঁটার মতো —যেখানে যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যু আসতে পারে।
কারণ হতে পারে নির্যাতন, প্রহরীদের নিষ্ঠুরতা, অসুখ, কিংবা হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড।
একজন প্রাক্তন বন্দির বর্ননা শুনলাম ভিডিওতে, তিনি বলছেন...
“যখন চুল কাটার সময় হতো, তিন-চারজন প্রহরী এসে চিৎকার করত—‘হাঁটু গেড়ে বসো।’
আমরা হাঁটু গেড়ে বসে পড়তাম।
তারা পুরোনো হাতচালিত মেশিন দিয়ে মাথা কামাত। সেই মেশিন দিয়ে অনবরত মাথায় আঘাত করত, আমাদের মাথা রক্তে মাথা ভেসে যেত।
তারপর ভ্রু কামাত, শেষে পাপড়ি।
সবচেয়ে কষ্টের ছিল, যখন তারা চোখের পাপড়ি তুলে দিত।”
এইসব ছিল কারাগারের নিয়মিত নির্যাতন ।
এছাড়াও প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার বন্দিদের জন্য নির্ধারিত থাকত নির্যাতনের সেশন, শিশু বন্দীদের জন্যও সেটি একইরকম ভয়ানক ছিল।
একই সঙ্গে ৪৫টি ফাঁসির মঞ্চে একসাথে ১০ জন করে বন্দি ফাঁসিতে ঝুলত।
১৯৮১ সালে, কারাগারে কলেরা ও যক্ষ্মায় যথাক্রমে ৭০০ ও ৪০০ বন্দি মারা যায়।
সিরিয়ান পোর্টালের ভিডিও তে একজন বেচেঁ ফেরা বন্দীর বক্তব্য ছিল ঠিক এরকম __
__প্রহরীরা বলতো “তোমরা তোমাদের শেষ গন্তব্যে এসেছো।
এখানে কোনো ঈশ্বর নেই। ঈশ্বরকে তাদমুরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আমরা-ই ঈশ্বর। জীবন দিই, জীবন নিই।”
এই কথাগুলো বন্দিদের মনে ঈশ্বর ও আশার শেষ আলো নিভিয়ে দিত।
যখন ২০০১ সালের পর Tadmor-এর কয়েকজন বন্দি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কথা বলা শুরু করে,
তখন বিশ্ব প্রথম জানে এই নরকের প্রকৃত রূপ।
Human Rights Watch, Amnesty International, এবং UN Human Rights Council—
সবাই একে “institutionalized torture chamber” বলে ঘোষণা করে।
এবার আসি "The Tadmor Massacre" এর কথায়। ১৯৮০ সালের ২৭ জুন, সিরিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এক সকাল।
এই দিনেই ঘটে যায় একটি এমন হত্যাযজ্ঞ, যা শুধু সিরিয়া নয়, মানবসভ্যতার বিবেককে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
এটি ঘটেছিল প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদ ও তাঁর ভাই রিফাত আল-আসাদের নির্দেশে।
ঠিক একদিন আগে প্রেসিডেন্টের ওপর এক নিরাপত্তারক্ষীর হামলার প্রতিশোধ হিসেবে, এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
গবেষণা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেদিন প্রেসিডেন্টের সেনাবাহিনী সরাসরি বন্দিদের ডর্মেটরি তে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল ।সেই সাথে ছুড়েছিল গ্রেনেড এবং হাতবোমা ।
মাত্র কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ২০০০ বন্দিকে হত্যা করা হয়, যাদের মধ্যে ছিল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক এমনকি সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত। নিহতদের পরে গণকবরে পুঁতে ফেলা হয়।
এই গণহত্যার খবর বাইরের পৃথিবীর কেউ জানতই না।
কিন্তু ১৯৮১ সালে জর্ডানে ধরা পড়া কিছু সিরীয় অফিসার, এই হত্যাকাণ্ডের জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেয়।
তারপরই বিশ্ব জানতে পারে তাদমুরের ভয়াবহতা।
২০০১ সালে কারাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয়,
বন্দিদের সরিয়ে নেওয়া হয় নতুন নির্মিত সেডনাইয়া (Sednaya) কারাগারে।
সেটিও Tadmor এর চেয়ে কোনো অংশে কম ভয়ঙ্কর ছিল না।সেই প্রসঙ্গে আর আপাততঃ গেলাম না।
Amnesty International এবং Human Rights Watch এর মতে,
“Tadmor Prison ছিল এক জীবন্ত নরক।
এখানে মানবতার মৃত্যু হয়েছিল ধীরে, নিয়মিতভাবে।”
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়—
Tadmor Military Prison এর নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না;
এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের একটি পরিকল্পিত রূপ।
২০১৫ সালে, যখন ISIS পালমিরা শহর দখল করে,
তারা প্রতীকীভাবে তাদমুর কারাগার ধ্বংস করে দেয়।
তাদের যুক্তি ছিল—এটি নির্যাতনের প্রতীক।
অবশ্য ধ্বংস করেও তারা স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারেনি।
২০১৭ সালে বেঁচে ফেরা কিছু বন্দি মিলিত হয়ে গঠন করে “Association of Tadmor Survivors।”
তারা বলে,
“আমরা চাই না কেউ ভুলে যাক, কীভাবে ভয় দিয়ে একটা জাতিকে চুপ করানো হয়েছিল। আমরা তাদমুর থেকে বেঁচে ফিরেছি, যাতে পৃথিবী জানে, ভয় দিয়ে কখনো শাসন করা যায় না।
Tadmor Military Prison কেবল সিরিয়ার ইতিহাস নয়, এটি মানবতার ইতিহাসে লেখা একটি কালো অধ্যায়।
তাদমুর কারাগার,
রুচিরা সুলতানা