20/04/2026
📌 সন্তান গড়ার দায়িত্ব — ডিগ্রি নয়, দ্বীনই হোক সন্তানের সত্যিকারের পরিচয়.....
---
পৃথিবীতে একজন পিতামাতার জীবনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এবং একই সাথে সবচেয়ে বড় সাফল্যের ক্ষেত্র হলো তার সন্তানকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। শুধু পার্থিব শিক্ষা, সম্পদ বা ডিগ্রি দিয়ে সন্তানের জীবন পরিপূর্ণ হয় না। যদি সন্তানের হৃদয়ে পবিত্র কুরআনের আলো এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ না থাকে, তাহলে সেই জীবন প্রকৃত অর্থে সফল নয়। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে আজকের আলোচনায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে সন্তান গড়ার দায়িত্ব ও গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলব।
---
🟦এক. সন্তান — আমানত, পরীক্ষা ও উপহার
সন্তান কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পিতামাতার কাছে একটি পবিত্র আমানত। এই আমানতের সঠিক হেফাজত করাই পিতামাতার প্রধান দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন —
> "হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।"
> — (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬ : ৬)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সরাসরি পিতামাতাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, শুধু নিজে জান্নাতের পথে চললে চলবে না — পরিবার এবং সন্তানকেও সেই পথে পরিচালিত করতে হবে। এটি একটি ফরজ দায়িত্ব।
আল্লাহ আরও বলেন —
> "সম্পদ ও সন্তান হলো পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।"
> — (সূরা আল-কাহফ, ১৮ : ৪৬)
কিন্তু এই সৌন্দর্যকে যদি সঠিকভাবে পরিচালনা না করা হয়, তাহলে এই সৌন্দর্যই আখিরাতে কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
---
🟦দুই. সন্তানকে দীনি শিক্ষা দেওয়া — পিতামাতার সর্বোচ্চ কর্তব্য
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানের দীনি তরবিয়তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন —
> "প্রতিটি সন্তান ফিতরাতের (ইসলামি স্বভাব) উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়।"
> — (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৩৮৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬৫৮)
এই হাদিসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, একটি শিশু ইসলামের স্বভাব নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু পিতামাতার অমনোযোগিতা ও ভুল পরিচালনার কারণে সে সঠিক পথ থেকে সরে যেতে পারে। সুতরাং দায়িত্বটি সম্পূর্ণরূপে পিতামাতার।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেছেন —
> "পিতার পক্ষ থেকে সন্তানকে দেওয়া সর্বোত্তম উপহার হলো উত্তম আদব-আখলাক।"
> — (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১৯৫২; শায়খ আলবানি এটিকে হাসান বলেছেন)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সম্পদ বা ডিগ্রি নয় — উত্তম চরিত্রই সন্তানের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার।
---
🟦 তিন. কুরআনের আলো ছাড়া জীবন অন্ধকার
অনেক পিতামাতা সন্তানকে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান, লক্ষ টাকা খরচ করেন, কিন্তু কুরআন শেখানোর সময় করে উঠতে পারেন না। এটি একটি ভয়াবহ ভুল।
আল্লাহ তাআলা বলেন —
> "নিশ্চয়ই এই কুরআন সেই পথ দেখায় যা সবচেয়ে সঠিক।"
> — (সূরা আল-ইসরা, ১৭ : ৯)
কুরআন শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, এটি একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। কুরআনের শিক্ষা থেকে দূরে থাকা মানে জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী আলো থেকে সন্তানকে বঞ্চিত করা।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন —
> "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।"
> — (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫০২৭)
সন্তানকে কুরআন শেখানো মানে তাকে সর্বোত্তম মানুষদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা। এর চেয়ে বড় পাওনা একজন পিতামাতার জন্য আর কী হতে পারে?
---
🟦চার. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ — সন্তানের জন্য পথের আলো
শুধু কুরআন নয়, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহও সন্তানের জীবনের পাথেয় হওয়া প্রয়োজন। কারণ কুরআন ও সুন্নাহ একে অপরের পরিপূরক।
আল্লাহ তাআলা বলেন —
> "নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ, তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।"
> — (সূরা আল-আহযাব, ৩৩ : ২১)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ও আদর্শই হলো মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম মডেল। সন্তানের সামনে সেই আদর্শ তুলে ধরা পিতামাতার একটি পবিত্র দায়িত্ব।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন —
> "আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এই দুটো আঁকড়ে ধরবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না — আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।"
> — (মুওয়াত্তা মালিক, হাদিস নং ১৬৬১; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদিস নং ৩১৮)
এই হাদিসই প্রমাণ করে, কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা ছাড়া জীবনে সত্যিকারের সফলতা আসে না।
---
🟦 পাঁচ. সন্তানের জন্য সময় দেওয়া — একটি ইবাদত
আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে পিতামাতা সন্তানকে সময় দিতে ভুলে যাচ্ছেন। টাকা, গাড়ি, বাড়ি সবই দিচ্ছেন, কিন্তু নিজের উপস্থিতি দিচ্ছেন না। অথচ সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো পিতামাতার সান্নিধ্য, ভালোবাসা এবং সঠিক পথনির্দেশনা।
হযরত লুকমান আলাইহিস সালাম তার পুত্রকে যেভাবে নসিহত করেছিলেন, আল্লাহ তাআলা তা কুরআনে উল্লেখ করেছেন —
> "স্মরণ করো, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে দিতে বলেছিল — হে প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক হলো সবচেয়ে বড় জুলুম।"
> — (সূরা লুকমান, ৩১ : ১৩)
লুকমান আলাইহিস সালামের সন্তানকে দেওয়া উপদেশগুলো কুরআনে সংরক্ষিত হয়েছে। কারণ সেগুলো ছিল প্রজ্ঞাপূর্ণ ও চিরন্তন। প্রতিটি পিতামাতাকে তার সন্তানের সাথে এভাবেই কথা বলতে হবে — ভালোবাসার সাথে, প্রজ্ঞার সাথে।
---
🟦 ছয়. সন্তান ভালো হলে পিতামাতাও উপকৃত হন মৃত্যুর পরেও
এখানে একটি অসাধারণ বাস্তবতা রয়েছে। একজন পিতামাতা সন্তানকে দীনদার করে গড়ে তুললে, মৃত্যুর পরেও সেই সুফল পেতে থাকবেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন —
> "যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি জিনিস ছাড়া — সাদাকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দ্বারা উপকার পাওয়া যায়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।"
> — (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬৩১)
এই হাদিসটি স্পষ্ট করে দেয় — নেক সন্তান শুধু দুনিয়ায় নয়, আখিরাতেও পিতামাতার সম্পদ। সন্তানকে দীনদার করে গড়ে তোলা মানে আখিরাতের জন্য বিনিয়োগ করা।
---
🟦 সাত. ডিগ্রি বনাম দীন — ভারসাম্যই আদর্শ পথ
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার — ইসলাম কখনো পার্থিব শিক্ষার বিরোধী নয়। ইসলাম জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন —
> "প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।"
> — (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২২৪; শায়খ আলবানি সহিহ বলেছেন)
কিন্তু পার্থিব জ্ঞানের সাথে দীনি জ্ঞানের সমন্বয় না থাকলে সেই শিক্ষা মানুষকে কখনো প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়তে পারে না। ডিগ্রিধারী মানুষ হওয়া এবং প্রকৃত মানুষ হওয়া — এই দুটো এক কথা নয়। প্রকৃত মানুষ হতে হলে দীনের আলো অপরিহার্য।
---
🟦 আট. পিতামাতার ব্যর্থতার পরিণতি
যে পিতামাতা সন্তানকে শুধু পার্থিব সুখ-সম্পদের দিকে ধাবিত করেন এবং দীনি শিক্ষা থেকে দূরে রাখেন, তাদের জন্য কুরআনে সতর্কবাণী রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন —
> "হে মুমিনগণ! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এই কারণে গাফেল হয়, তারাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত।"
> — (সূরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩ : ৯)
সন্তানের পেছনে সময় ও সম্পদ ব্যয় করতে গিয়ে যদি দীনের দিকটি উপেক্ষিত হয়, তবে এই সন্তানই হবে পরকালে ক্ষতির কারণ।
---
🟦নয়. কীভাবে সন্তানকে গড়বেন — ব্যবহারিক পদক্ষেপ
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সন্তান গড়ার কিছু ব্যবহারিক পথ —
◼️প্রথমত, শৈশব থেকেই সন্তানকে কালিমা, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া শেখান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন —
> "সাত বছর বয়সে সন্তানকে নামাজের আদেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে না পড়লে তাকে প্রহার করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।"
> — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯৫; শায়খ আলবানি সহিহ বলেছেন)
◼️দ্বিতীয়ত, নিজে আদর্শ হোন। সন্তান বাবার মুখের কথা নয়, বাবার জীবন দেখে শেখে।
◼️তৃতীয়ত, প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় সন্তানকে দিন। তার কথা শুনুন, তার প্রশ্নের উত্তর দিন, তার সাথে দীনি বিষয় নিয়ে আলোচনা করুন।
◼️চতুর্থত, ভালো সঙ্গ নিশ্চিত করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন —
> "মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে। অতএব, তোমরা লক্ষ্য করো কার সাথে বন্ধুত্ব করছ।"
> — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৮৩৩; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৩৭৮; শায়খ আলবানি হাসান বলেছেন)
◼️পঞ্চমত, সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করুন। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তার সন্তানের জন্য দোয়া করতেন —
> "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী করো এবং আমার বংশধরদেরও। হে আমাদের প্রতিপালক! আমার দোয়া কবুল করো।"
> — (সূরা ইব্রাহিম, ১৪ : ৪০)
---
একটি সন্তান পৃথিবীর সমস্ত ডিগ্রি ও সম্পদ অর্জন করতে পারে, কিন্তু যদি তার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় না থাকে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ না থাকে, কুরআনের আলো না থাকে — তাহলে সেই সন্তান প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়নি। আর এই ব্যর্থতার দায় বহন করতে হবে তার পিতামাতাকেও।
তাই আজই সংকল্প নিন — সন্তানকে সময় দিন, তার সাথে কুরআন পড়ুন, রাসুলের গল্প বলুন, নামাজে পাশে দাঁড় করান, দোয়া করুন। পার্থিব সাফল্যের পাশাপাশি তাকে আখিরাতের সাফল্যের দিকে পরিচালিত করুন।
তখনই আপনার জীবন সফল হবে, তখনই আপনি একজন সত্যিকারের পিতামাতা হিসেবে আল্লাহর দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে আদর্শ পিতামাতা হওয়ার এবং সন্তানদের কুরআন ও সুন্নাহর আলোয় গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।