26/08/2025
ছোট মফস্বল শহরের কিছু কিছু আচার আমার খুব ভালো লাগে। এখানে কেউ মারা গেলে বা কারো বিয়ে শাদিতে মোটামুটি দূর দূরান্তের আত্মীয় স্বজনরা সবাই একত্রিত হয়। বিয়েতে দাওয়াতের একটা বিষয় থাকলেও মৃত্যুর খবর পাওয়া মাত্র সমবেদনা জানাতে সবাই নিজ দায়িত্বে মৃতবাড়িতে একত্রিত হন। সবাই একত্রিত হওয়ার পর সেখানে নানা ধরনের আলোচনা - সমালোচনা, হাঙ্গামা হয় সেটা অন্য আলাপ তবে শোক প্রকাশ ও সহমর্মিতা জানানোই হলো প্রথম উদ্দেশ্য।
শহর থেকে যত গ্রামের দিকে যাওয়া যাবে এই সহমর্মিতার রূপ যেন আরও বৃহৎ হয়ে ধরা পরে। গ্রামে কারো শোক বা আনন্দই কারোর একার নয়।
গ্রামের বিয়েগুলোতে দেখা যায় আশেপাশের দশ বাড়ির লোক সবাই মিলে কাজ করছে, কেউ রান্নার কাজ করছে তো কেউ খাবার টেবিল সামলাচ্ছে আর মহিলারা সবাই মিলে কাটাকুটি করে ফেলছে আবার কেউবা কনে সাজাচ্ছে। এখানে বাড়ির লোক কে আর পাড়ায় লোক কে আলাদা করা যায় না, কিন্তু দিন শেষে সব কাজ হয়ে যাচ্ছে। অথচ নগর জীবনে এইসব কাজ করানো লাগে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ক্যাটারিং, মেকাপ আর্টিস্ট, ওয়েটার আরও নানা নামের আতিশয্য যোগ করে আর পকেট ভর্তি কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে।
শহরে মৃতুসংবাদ পেলে সবাই শেষযাত্রায় সঙ্গী হতে বা পরিবারের পাশে থাকার জন্য যায় ঠিক আছে, কিন্তু এর পরবর্তী দায়িত্বগুলো খুব একটা পালন করা হয় না। অন্যদিকে গ্রামের কোনও বাড়িতে কেউ মারা গেলে সেই বাড়িতে মোটামুটি ১০-১৫ দিন, কখনো কখনো মাসখানেক চুলা জ্বালানো হয় না। মৃত বাড়ির লোকজন এবং তাদের বাড়িতে আসা বিশাল সংখ্যক লোকজনের খাবারের দায়িত্ব নিজেরাই নিয়ে নেয় প্রতিবেশীরা। যারা খাবার পাচ্ছে তারা হয়ত জানেই না কারা কোন বেলায় খাবার দিচ্ছে। অথচ শহুরে আমরা একবেলার বেশি দুইবেলার খাবার খাওয়ানোর কথা ভাবতেই পারি না৷ গ্রামের অল্প শিক্ষিত, স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর এই উদার দায়িত্ববোধ আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করে।
গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে নগরের দিকে আসলে এইসকল কিছু অচেনা মনে হয়। উপরের ফ্ল্যাটের বিয়েতে আমাদের দাওয়াত পাওয়া হয় না, দরজার অপারের কেউ মারা গেলো কিনা জানাই হয় না! এখানে তালতো ভাইয়ের শাশুড়িকে দেখতে যাওয়া তো দূর, নিজের আপন মামা বা নানাকেও শেষবার ছুঁয়ে দেখার ভাগ্য মেলে না আমাদের। জন্মদায়ক মা-বাবা মারা গেলেও এক বা দুই দিনের বেশী ছুটি চাওয়ার আশা রাখাও ভয়াবহ অপরাধ!
এইসব ভেবে রাতে শুয়ে শুয়ে খুব আয়েশ করে স্বপ্ন দেখছিলাম- এই তো আর বছর বিশেক! তারপর চাকরি বাকরি সব ছেড়ে আবার বাড়ি ফিরব, আমার ছোট শহরে ফিরব। যেখানে পথ চলতে চলতে দেখা হয়ে যাবে শৈশবের বাটারবন মামার সাথে বা রঙিন পোস্টারের দোকানি আঙ্কেলের সাথে হবে নিরব হাসি বিনিময় !
আর বছর বিশেক পরই আমি ফিরব সত্যি....!! ভেবেই যেন চোখগুলো ছলছল করে উঠলো আনন্দে । কিন্তু হঠাৎ মনে হলো- ফিরব, তবে কার কাছে? চলতি পথের চেনা মুখগুলো তো এখনই একে একে সবাই অন্তহীনের পথে যাত্রা করছেন। হয়ত চেনা মগড়া, চেনা বটগাছটা ততদিনে কিছুই আর থাকবে না.....!! চেনাজানার মোড়কে মোড়া অচেনা একটা শহরে আবারো একলা আমি পথ হেঁটে চলব....??
এই কংক্রিটের নগরীতে আসা যায় ঠিক, তবে এখান থেকে আর ফেরা হয় না, ফেরা যায় না......!!