15/05/2026
বাংলার পটচিত্র ও লোকশিল্পের ইতিহাস
(লেখক ও চিত্রশিল্পী) মোঃ কায়জার রহমান
পটচিত্র বাংলার অন্যতম প্রাচীন লোকশিল্প। বহু শত বছর আগে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের বিনোদন, শিক্ষা ও ধর্মীয় কাহিনী প্রচারের জন্য পটচিত্রের সৃষ্টি হয়। “পট” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “পট্ট” শব্দ থেকে, যার অর্থ কাপড় বা ক্যানভাস। প্রাচীনকালে কাপড়, তালপাতা কিংবা কাগজের উপর ছবি এঁকে গল্প বলা হতো। সেই ছবিকেই পটচিত্র বলা হয়।
বাংলার পটুয়া শিল্পীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে পটচিত্র প্রদর্শন করতেন। তারা ছবি দেখানোর পাশাপাশি গান গেয়ে গল্প বলতেন। এই গানকে বলা হতো “পটের গান”। সাধারণ মানুষ পটের মাধ্যমে ধর্মীয় কাহিনী, সামাজিক শিক্ষা এবং লোককাহিনী জানতে পারত।
ভারতীয় উপমহাদেশে পটচিত্রের ইতিহাস অনেক পুরোনো। ধারণা করা হয়, পাল যুগে পটচিত্রের প্রচলন আরও বিস্তৃত হয়। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রেও পটচিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরে হিন্দু পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত এবং কৃষ্ণলীলা পটচিত্রের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পটচিত্রের আলাদা ধারা দেখা যায়। ময়মনসিংহ, যশোর, কুমিল্লা ও খুলনা অঞ্চলে পটচিত্র বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর অঞ্চলের পটচিত্রও বিখ্যাত।
পটচিত্র সাধারণত দীর্ঘ স্ক্রল আকারে তৈরি করা হতো। একে “জড়ানো পট” বলা হয়। আবার একক ছবির পটও তৈরি হতো। পটুয়া শিল্পীরা প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করতেন। গাছের পাতা, ফুল, মাটি, কয়লা ও খড়ি থেকে রং তৈরি করা হতো।
পটচিত্রে উজ্জ্বল রং বেশি ব্যবহার করা হয়। লাল, হলুদ, নীল ও সবুজ রং পটচিত্রে বেশি দেখা যায়। ছবিগুলো সাধারণত সমতল আকারে আঁকা হয় এবং এতে পার্সপেক্টিভ কম ব্যবহার করা হয়।
বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের প্রতিফলন পটচিত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এতে ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও সামাজিক সমস্যা, নৈতিক শিক্ষা, নদীভাঙন, বন্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাও চিত্রিত হয়েছে।
ব্রিটিশ আমলে ছাপাখানা ও আধুনিক বিনোদনের প্রসারের ফলে পটচিত্রের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। তবুও বাংলার লোকশিল্প হিসেবে পটচিত্র আজও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবে পটচিত্র প্রদর্শিত হয়। অনেক শিল্পী আধুনিক বিষয় নিয়েও পটচিত্র আঁকছেন। লোকশিল্প গবেষকরা মনে করেন, পটচিত্র শুধু ছবি নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনের দলিল।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পটচিত্র সংরক্ষণে কাজ করছে। বর্তমানে চারুকলা শিক্ষার্থীদের কাছেও পটচিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম।
---
গদ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ MCQ
১. “পট” শব্দটি কোন ভাষা থেকে এসেছে?
ক) বাংলা
খ) সংস্কৃত
গ) আরবি
ঘ) ফারসি
২. “পট্ট” শব্দের অর্থ কী?
ক) গান
খ) রং
গ) কাপড় বা ক্যানভাস
ঘ) গল্প
৩. পটচিত্র বাংলার কী ধরনের শিল্প?
ক) আধুনিক শিল্প
খ) লোকশিল্প
গ) ডিজিটাল শিল্প
ঘ) বিমূর্ত শিল্প
৪. পটুয়া শিল্পীরা কী করতেন?
ক) শুধু গান গাইতেন
খ) শুধু ছবি আঁকতেন
গ) ছবি দেখিয়ে গান গেয়ে গল্প বলতেন
ঘ) নাটক করতেন
৫. পটের সঙ্গে গাওয়া গানকে কী বলা হয়?
ক) বাউল গান
খ) পটের গান
গ) ভাটিয়ালি
ঘ) জারি গান
৬. পটচিত্রে কোন কাহিনী বেশি দেখা যায়?
ক) বিজ্ঞান
খ) ধর্মীয় ও লোককাহিনী
গ) প্রযুক্তি
ঘ) রাজনীতি
৭. কোন যুগে পটচিত্রের প্রচলন বিস্তৃত হয়?
ক) মুঘল যুগ
খ) পাল যুগ
গ) সেন যুগ
ঘ) ব্রিটিশ যুগ
৮. বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে?
ক) নাটক
খ) পটচিত্র
গ) সিনেমা
ঘ) যাত্রা
৯. রামায়ণ ও মহাভারত কোন শিল্পে বেশি দেখা যায়?
ক) ডিজিটাল আর্ট
খ) পটচিত্র
গ) আলোকচিত্র
ঘ) ভাস্কর্য
১০. বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে পটচিত্র জনপ্রিয় ছিল?
ক) ময়মনসিংহ
খ) যশোর
গ) খুলনা
ঘ) সবগুলো
১১. পশ্চিমবঙ্গের কোন অঞ্চলের পটচিত্র বিখ্যাত?
ক) নদীয়া
খ) মেদিনীপুর
গ) মুর্শিদাবাদ
ঘ) কলকাতা
১২. দীর্ঘ স্ক্রল আকারের পটকে কী বলা হয়?
ক) গোল পট
খ) জড়ানো পট
গ) আধুনিক পট
ঘ) বৃত্তাকার পট
১৩. পটুয়া শিল্পীরা কী ধরনের রং ব্যবহার করতেন?
ক) কেমিক্যাল রং
খ) প্রাকৃতিক রং
গ) ডিজিটাল রং
ঘ) প্লাস্টিক রং
১৪. কোনটি প্রাকৃতিক রঙের উৎস নয়?
ক) ফুল
খ) মাটি
গ) কয়লা
ঘ) প্লাস্টিক
১৫. পটচিত্রে কোন রং বেশি দেখা যায়?
ক) লাল
খ) হলুদ
গ) নীল
ঘ) সবগুলো
১৬. পটচিত্রে সাধারণত কী কম ব্যবহার করা হয়?
ক) রং
খ) রেখা
গ) পার্সপেক্টিভ
ঘ) নকশা
১৭. পটচিত্রে কীসের প্রতিফলন দেখা যায়?
ক) গ্রামীণ জীবন
খ) লোকজ সংস্কৃতি
গ) সামাজিক শিক্ষা
ঘ) সবগুলো
১৮. পটচিত্রে কোন বিষয়ও চিত্রিত হয়েছে?
ক) মুক্তিযুদ্ধ
খ) বন্যা
গ) নদীভাঙন
ঘ) সবগুলো
১৯. কোন আমলে পটচিত্রের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে?
ক) পাল আমল
খ) সেন আমল
গ) ব্রিটিশ আমল
ঘ) মুঘল আমল
২০. বর্তমানে পটচিত্র কোথায় প্রদর্শিত হয়?
ক) সাংস্কৃতিক উৎসবে
খ) বিজ্ঞান মেলায়
গ) স্টেডিয়ামে
ঘ) কারখানায়
Page: Artist Home
শেয়ার করুন।