28/11/2025
ঘরে বসে নিটিং শিখবেন যেভাবে
ঘরে বসে কি শূন্য থেকে নিটিং (বুনন) শেখা সম্ভব? উত্তরটা হচ্ছে, হ্যাঁ। অবশ্যই সম্ভব। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নিটিংয়ের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি বেড়েছে। যারা ঘরে বসে নিটিং করেন, বেশিরভাগই শিখেছেন অনলাইনের ফ্রি সোর্স থেকে। ব্যাগ থেকে শুরু করে টেবিল রানার, সোয়েটার, টুপি, ব্যাগ চার্ম, কুশন কাভার, কোস্টার এমনকি বুক কাভারও আছে এই তালিকায়। যা আপনিও বানাতে পারবেন। এর জন্য দরকার একটু ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্য্য।
এটা এমন এক হবি, যা আপনাকে পরার মত সুন্দর কিছু তৈরির পাশাপাশি মানসিক আরো ভালো থাকতে সাহায্য করবে। দুই হাত ব্যবহার করে করতে হয় এমন হবিগুলি সাধারণত স্ট্রেস কমাতে এবং মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি প্যাটার্ন মনে রাখা ও স্টিচ করার মাধ্যমে মস্তিষ্ক সক্রিয় হয় এবং আমাদের সৃজনশীলতা বাড়ে। হাতের ছোটখাটো নড়াচড়া ও সুঁই পরিচালনার মাধ্যমে মোটর স্কিল ও আঙুলের নমনীয়তা উন্নত হয়।
এবার আসুন জেনে নেওয়া যাক, নিটিংয়ের শুরু থেকে শেষ এবং কীভাবে আপনিও সহজে তা শিখতে পারেন।
কীভাবে কাজ করে ও তার ইতিহাস
দুটি সাধারণ স্টিচ থাকে নিটিংয়ে: knit (লুপকে সামনে থেকে টেনে আনা) এবং purl (লুপকে পিছন থেকে টানা)। এগুলি মিলিয়েই বিভিন্ন প্যাটার্ন (জাস্ট plain, rib, cable, fair isle/colourwork ইত্যাদি) তৈরি হয়। হাতে করতে হলে সাধারণত দুটি সোজা নীডেল ব্যবহার করে বা সার্কুলার নীডেলে টিউব-আকৃতির নিট তৈরি করা যায়। মেশিন নিটিং-এও মূলত filling (weft) এবং warp নামে দুই ধরনের পদ্ধতি আছে।
নিটিংয়ের ইতিহাস অনেক পুরনো। এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শনগুলি মিশর থেকে আসা, যা প্রায় ১১শ শতকের। তখন এই নিট মূলত মোজা বা বুট বানানোর জন্য ব্যবহার হতো। এই নিটগুলিতে দেখা যায় রঙিন প্যাটার্ন এবং শর্ট-রো হীলের মতো সূক্ষ্ম প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, যা আরও আগের নিটিং প্রচলনের ইঙ্গিত দেয়।
মধ্যযুগে ইউরোপে নিটিং পেশা ও গিল্ড (মধ্যযুগে ইউরোপে তৈরি হওয়া এক ধরনের পেশাজীবী সংঘ বা সমিতি) গড়ে ওঠে। তখন এটি পুরুষশাসিত পেশা হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে ঘরকুনে মানুষ এবং নারীদের জন্য তা হস্তশিল্পে পরিণত হয়। স্কটল্যান্ডের আইল্যান্ডগুলিতে (যেমন Fair Isle) নিটিং-এর ঐতিহ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার মৎস্যজীবী সমাজে নিটিং শুধু পোশাক তৈরি করাই নয়, বরং জটিল রঙিন প্যাটার্নগুলি ফ্যাশন ও জীবিকা, উভয় উদ্দেশ্য পূরণ করতো।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯১৪–১৮ সালে, অনেক মানুষ স্বেচ্ছায় সৈন্যদের জন্য মোজা, টুপি, স্কার্ফ বানাতে শুরু করে। সেই সময় রেড ক্রস এবং বিভিন্ন ম্যাগাজিনও নিটিং প্যাটার্ন ছাপত, যাতে মানুষ সহজে বানাতে পারে। ২০শ শতকের মাঝামাঝিতে এসে নিটওয়্যার ফ্যাশনের অংশ হয়ে ওঠে। যেমন, Coco Chanel পর্যন্ত পোশাকে নিট ব্যবহার করেছিলেন।
২০০০-এর দশকে ইন্টারনেট, ব্লগ, অনলাইন কমিউনিটিতে এবং “হ্যান্ডমেড” আন্দোলনের কারণে নিটিং আবার জনপ্রিয়তা ফিরে পায়। এখন অনেকেই ঘরে বসে নিটিং শেখেন এবং নিজ হাতে তৈরি পণ্য অনলাইনে বিক্রি করে আয় করেন।
নিটিংয়ে ব্যবহৃত উপকরণ
নিটিং করতে কয়েকটি মৌলিক জিনিসের দরকার হয়: সুতা, নীডেল, আর প্যাটার্ন। এগুলি একসাথে মিলে তৈরি হয় একটি নিটিং সেট।
# সুতা (Yarn)
নিটিং-এর প্রধান উপাদান হলো সুতা। এই সুতার মাধ্যমেই কাপড় তৈরি হয়।
বিভিন্ন ধরনের সুতা নিটিংয়ে ব্যবহার করা যায়, যেমন:
• উল (Wool): ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত; সোয়েটার, টুপি, মোজা বানানোর জন্য ভালো।
• কটন (Cotton): হালকা, বায়ু চলাচল করে, তাই গরমের কাপড়ে বেশি ব্যবহার হয়।
• সিল্ক (Silk): মসৃণ ও চকচকে কাপড় তৈরি হয়, সাধারণত দামি ও নরম পোশাকে ব্যবহৃত।
• অ্যাক্রিলিক বা মিশ্র ফাইবার (Acrylic / Blended fibers): কৃত্রিমভাবে তৈরি, টেকসই ও সস্তা — শেখার সময় বা দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস বানাতে ভালো।
• নভেলটি ইয়ার্ন (Novelty yarn): আলাদা টেক্সচার বা রঙের জন্য ব্যবহৃত হয়, যেমন ফুরফুরে বা উজ্জ্বল সুতা।
# সুঁই বা নীডেল (Knitting Needles)
নিটিং করার সময় সুতাকে লুপে গেঁথে রাখতে নীডেল ব্যবহার করা হয়। এগুলি বিভিন্ন উপকরণে তৈরি হতে পারে:
• কাঠ (Wooden): হালকা, হাতে আরামদায়ক; শুরুর দিকের শেখার জন্য ভালো।
• মেটাল (Metal): মসৃণ ও দ্রুত কাজ হয়; অভিজ্ঞ নিটাররা সাধারণত এটি পছন্দ করেন।
• প্লাস্টিক (Plastic): হালকা ও সস্তা, তবে কিছুটা কম টেকসই।
নীডেলের আকারও বিভিন্ন হয়। যেমন: মোটা, পাতলা, লম্বা বা সার্কুলার (বৃত্তাকারে)। যে সুতার পুরুত্ব যেমন, সেই অনুযায়ী নীডেল নির্বাচন করতে হয়।
শুরুতে কী কী কিনবেন?
নিটিং শুরু করতে খুব বেশি উপকরণ লাগে না, কিছু মৌলিক জিনিস থাকলেই আপনি অনায়াসে শিখতে পারবেন। প্রথমেই প্রয়োজন সুতা (yarn), যার মাধ্যমে বোনা হবে। শুরুতে মাঝারি পুরুত্বের (যেমন “worsted weight”) হালকা রঙের সুতা নিন, কারণ এতে স্টিচগুলি স্পষ্ট দেখা যায়। এরপর লাগবে এক জোড়া নীডেল (knitting needles)—শুরুর জন্য কাঠ বা বাঁশের সোজা নীডেল সবচেয়ে ভালো, কারণ এগুলির ওপর সুতা সহজে পিছলে যায় না এবং হাতে ধরাও আরামদায়ক।
পাশাপাশি কিছু ছোট আনুষঙ্গিক জিনিস দরকার হয়, যেমন—কাঁচি (সুতা কাটার জন্য), ট্যাপেস্ট্রি সূঁচ (শেষ প্রান্ত লুকিয়ে বা অংশ জোড়া দিতে), এবং মেজার টেপ বা স্কেল (মাপ নেওয়ার জন্য)। এই মৌলিক জিনিসগুলি থাকলে আপনিও ছোট স্কার্ফ, টুপি বা সোয়েটার প্র্যাকটিস করতে পারবেন।
নিটিং প্যাটার্নের ধরন ও তাদের ব্যাখ্যা
নিটিং প্যাটার্নের সহজ অর্থ হলো কাপড় বোনার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা, যাতে নির্দিষ্ট ডিজাইন ও গঠন তৈরি হয়। সাধারণভাবে নিটিং প্যাটার্নকে দুইভাবে ভাগ করা যায়—প্রকাশভঙ্গি অনুযায়ী এবং কাজের ধরন অনুযায়ী। প্রকাশভঙ্গির দিক থেকে তিনটি ধরণ বেশি প্রচলিত: (ক) লেখাচিত্রে প্যাটার্ন (Written Pattern)—যেখানে শব্দে ধাপে ধাপে নির্দেশ দেওয়া হয়, যেমন “Row 1: Knit 2, Purl 2”; এটি নতুনদের জন্য সহজবোধ্য। (খ) চিত্ররূপে প্যাটার্ন (Charted Pattern)—যেখানে প্রতীক ও চিহ্ন দিয়ে স্টিচ বোঝানো হয়, ফলে পুরো ডিজাইন চোখের সামনে কল্পনা করা যায়। (গ) মিশ্র প্যাটার্ন (Mixed Pattern)—যেখানে লেখা ও চিত্র একত্রে ব্যবহার হয়, জটিল নকশা বোঝাতে এটি খুব কার্যকর।
কাজের ধরন অনুযায়ীও নিটিং প্যাটার্নের নানা রূপ দেখা যায়। Basic বা Plain Knit Pattern সবচেয়ে সহজ, এতে গার্টার বা স্টকিনেট স্টিচ থাকে যা স্কার্ফ বা বেবি ব্ল্যাংকেটে ব্যবহৃত হয়। Rib Pattern-এ knit ও purl একসাথে করে ইলাস্টিক ধরনের কাপড় তৈরি হয়, যা হাতা বা গলার ধারে ব্যবহার হয়। Cable Pattern-এ স্টিচগুলি ক্রস করে দড়ির মতো পাকানো নকশা তৈরি হয়, আর Lace Pattern-এ ফাঁকা জায়গা রেখে হালকা, বাতাস চলাচলযোগ্য ডিজাইন বানানো হয়। এসব ছাড়াও Colorwork Pattern দুই বা তার বেশি রঙের সুতা দিয়ে তৈরি হয়—যেমন Fair Isle বা Intarsia—যেখানে রঙিন নকশা ফুটে ওঠে।
এছাড়া আরও রয়েছে Textured Pattern, যেখানে বিভিন্ন স্টিচ মিশিয়ে কাপড়ে উঁচুনিচু বা খসখসে টেক্সচার তৈরি হয় (যেমন Seed বা Moss stitch), আর Specialty বা Decorative Pattern, যা সম্পূর্ণভাবে অলংকারমূলক—ফুল, প্রাণীর ছবি, বা নাম-লোগোর ডিজাইন তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। সব মিলিয়ে, নিটিং প্যাটার্ন একদিকে যেমন বুননের “নকশা”, তেমনি এটি সৃজনশীলতার প্রকাশ—নতুন ডিজাইন, রঙ ও স্টিচের সমন্বয়ে প্রতিটি কাজকে আলাদা ও অনন্য করে তোলে।
ধাপে ধাপে অনলাইনে নিটিং শেখার উপায়
ভিডিও টিউটোরিয়াল দিয়ে শুরু করুন
নিটিংয়ের বেসিক শেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ভিডিও দেখা। YouTube, Instagram Reels, কিংবা Facebook ভিডিওতে অনেক অভিজ্ঞ নিটার ধীরে ধীরে হাতের ধরন, সুতা পেঁচানোর কৌশল, আর স্টিচ করার ধাপ শেখান।
যা লিখে সার্চ করবেন:
• “Knitting for beginners”
• “How to knit step by step”
• “Basic knit and purl stitches”
ফ্রি অনলাইন কোর্স বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন
অনেক ওয়েবসাইট আছে যেখানে বিনামূল্যে নিটিং শেখার কোর্স পাওয়া যায়। যেমন: Ravelry, AllFreeKnitting, VeryPink Knits, LoveCrafts ইত্যাদি। এগুলিতে ধাপে ধাপে নির্দেশ, প্যাটার্ন, এমনকি প্র্যাকটিস প্রজেক্ট (যেমন ছোট স্কার্ফ বা হ্যাট) দেওয়া থাকে। কিছু ওয়েবসাইটে PDF প্যাটার্ন ডাউনলোড করেও কাজ করা যায়।
অনলাইন কমিউনিটি বা গ্রুপে যুক্ত হন
শেখার সময় প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। এজন্য Facebook, Reddit বা Ravelry-তে অনেক নিটিং কমিউনিটি আছে, যেখানে নতুনরা অভিজ্ঞদের কাছ থেকে সহায়তা নিতে পারে। সেখানে ছবি আপলোড করে প্রশ্ন করলে দ্রুত পরামর্শ মেলে: যেমন, “এই স্টিচটা ভুল হয়েছে কি?” বা “কোন সুতাটা ভালো হবে?” এতে শুধু শেখাই নয়, অনুপ্রেরণাও পাওয়া যায়।
চাইলে আপনি নিজেই একটি ফেসবুক গ্রুপ খুলে চারপাশের মানুষদের, ফেসবুক বন্ধুদের উৎসাহ দিতে পারেন এই গ্রুপে যুক্ত হয়ে একটি নিটিং কমিউনিটির অংশ হতে। নিটিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত দীর্ঘ প্রজেক্ট শেষ করার অভিজ্ঞতা ধৈর্য, মনোবল এবং পরিকল্পনার দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
বিনামূল্যের প্যাটার্ন ডাউনলোড করে অনুশীলন করুন
ইন্টারনেটে হাজারো ফ্রি প্যাটার্ন পাওয়া যায়। শুরুতে সহজ প্যাটার্ন বেছে নিন: যেমন plain scarf বা rib stitch। ধীরে ধীরে জটিল ডিজাইন (lace, cable) চেষ্টা করতে পারেন। PDF প্যাটার্নগুলো প্রিন্ট করে পাশে রেখে ভিডিও দেখে অনুশীলন করলে শেখা আরও দ্রুত হয়।
নিটিং হাতে-কলমে শেখার কাজ, তাই প্রথমে ভুল হওয়াটা একদম স্বাভাবিক। ভিডিও বা টিউটোরিয়াল থামিয়ে ধীরে ধীরে চেষ্টা করুন, স্টিচ খুলে আবার শুরু করুন। প্রতিদিন অল্প সময়ের প্র্যাকটিসও আপনাকে উন্নতি করতে সাহায্য করবে। উন্নতি আনে। সঠিক গাইড নির্বাচন করে আপনিও ধীরে ধীরে নিজের হাতে সুন্দর স্কার্ফ, টুপি, এমনকি পুরো সোয়েটারও বুনে ফেলতে পারবেন!
লেখাঃ City Alo
From Crafty Jannat