11/05/2026
এক আলিমের ঘটনা থেকে এখনকার সকল পুরুষের জন্য কিছু কথা।
নোট: বিশেষ করে ব্যবসায়ী, মার্কেটার, ফ্রিল্যান্সার
আপনারদের কাছে হারাম ইনকামের সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়িয়েছে "মদ, গাঁজা, প*র্নোগ্রাফি, ১৮+ ওয়েবসাইট, বানানো ও তাতে কাজ না করা। অথচ যেভাবে নারীদেরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেন, ক্লায়েন্ট কমুনিকেশন, মিমস, প্রোডাক্টের সাথে নারী মডেল ব্যবহার করেন আর বলেন "আমি হালাল ইনকাম করি।" আবার ঘরে কেন অশান্তি বলে অভিযোগ করেন। কেন কোন কিছুতেই বারাকাহ পান না। কেন এক স্ত্রীতেই তার প্রশান্তি নেই। কেন অবিবাহিতরা প*র্নোগ্রাফি আর মা*স্টারবেশনে আসক্ত। সব কথার কিছু উত্তর পাবেন এই লেখাতে।
এবার আসল লেখায় আসি
একদিন তিনি শুক্রবারের জুম'আর আগে খুতবা তৈরি করছিলেন। সামনে কিতাবপত্র নিয়ে পড়াশোনা করছেন, নোট করছেন। শাইখের ছেলে সেসময় বাবার পাশে খেলাধুলা করছিল। বারবার বাবাকে ডিস্টার্ব করছিল, শাইখও ছেলের দুষ্টুমিতে কাজে মন দিতে পারছিলেন না। এদিকে জুম'আর সময়ও আর বেশি নেই। তাই তিনি একটা ম্যাগাজিন খুলে সেখানে একটা পৃথিবীর মানচিত্রের ছবি দেখলেন। তিনি ম্যাগাজিন থেকে মানচিত্রটি কেটে নিলেন। সেটাকে এলোমেলোভাবে কয়েক টুকরা করে ছেলের হাতে দিয়ে বললেন, যাও এই মানচিত্রের টুকরাগুলো জোড়া লাগিয়ে আনো, দেখি পারো কি না!
শাইখকে অবাক করে দিয়ে তার ছেলে কয়েক মিনিট পরই মানচিত্রের টুকরাগুলো জায়গামতো বসিয়ে নিয়ে এলো। শাইখ তো অবাক। ছেলের প্রতিভায় রীতিমত মুগ্ধ। তিনি মনে করেছিলেন এই কাজ করতে তার অনেক সময় লেগে যাবে, এই ফাঁকে তিনি নিজের কাজ শেষ করে ফেলবেন। কিন্তু ছেলে তো পুরো ফাটিয়ে দিল। তিনি খুবই কৌতূহল নিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এটা কীভাবে করলে? ছেলে জবাব দিল,
আসলে মানচিত্রের পেছনে একটা মানুষের ছবি ছিল। আমি মানচিত্র জোড়া লাগাইনি, মানুষটাকে জোড়া লাগিয়েছি। হাত, পা, মাথা জায়গামতো বসিয়ে দিয়েছি, এতে করে অপর পাশের পৃথিবীর মানচিত্রটাও অটোম্যাটিক জায়গামতো জোড়া লেগে গেছে।
শাইখ মনে মনে ভাবলেন, তিনি আজকের জুম'আর খুতবার টপিক পেয়ে গেছেন।
"When the men come together, the world also comes together."
সুতরাং এই ভাঙ্গা পৃথিবীটাকে জোড়া লাগানোর জন্য উম্মাহর 'পৌরুষ' ফিরিয়ে আনা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
আজকাল অনেকে নারীদের বিপথে যাওয়া নিয়ে কথা তোলেন। দেখুন ভাই মেয়েরা কীভাবে বিপথে যাচ্ছে, পর্দা ছেড়ে দিচ্ছে, ফাহেশা কাজে লিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু এটা একদিনে হয়নি। যেসব নারীরা বিপথে যাচ্ছে, তাদের আগে তাদের পুরুষর বিপথে গেছে। বিপথে যাওয়া নারীরা হায়া হারানোর আগে, এসব নারীদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা পুরুষেরা তাদের হায়া, গীরাহ, পৌরুষ হারিয়েছে।
যে ভাইগুলো বলছে নারীরা বিপথে চলে যাচ্ছে, সেই একই ভাইয়েরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড দিচ্ছে। সেই ছবি তার হোয়াটসএপের প্রফাইল পিকচার দিচ্ছে। তাই যাদের কাছেই তার ফোন নম্বর আছে, তাদের কাছে এখন তার স্ত্রীর ছবিও আছে। প্রতিদিন তার স্ত্রীর ছবি অন্যর দেখছে।
এক ভাই একদিন আমার কাছে এলেন তার স্ত্রীকে নিয়ে। হাসতে হাসতে নিজের স্ত্রীকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। আমি বিব্রত হয়ে কোনোমতে সালাম দিলাম। কিন্তু সেই মহিলা হাসতে হাসতে আমার দিকে হ্যান্ডসেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। আর পাশে তার স্বামী নির্লজ্জের মতো তখনো হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কাকে দোষ দেব, পৌরুষহীন এই ভাইকে, নাকি তার স্ত্রীকে?
রাসুল (সা.) বলেছেন, "এমন তিনজন ব্যক্তি আছে, যাদের দিকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কিয়ামতের দিন তাকাবেন না। তারা হচ্ছে
(১) যে পিতামাতার অবাধ্য,
(২) যে নারী বেশভূষায় পুরুষদের অনুকরণ করে
(৩) দাইয়ুস ব্যক্তি।” (নাসাঈ: ২৫৬২)
এখানে দাইয়ুস হলো সেই পুরুষ, যে তার অধীনস্ত নারীদের (মা, বোন, স্ত্রী) ব্যভিচার, ফাহেশা কাজে বাধা দেয় না। তারা পর্দা করছে না, এটা তার গায়ে লাগে না। তার স্ত্রী পরপুরুষের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে, এতে তার গা জ্বলে না। সে এমন ব্যক্তি, যে তার পৌরুষ হারিয়েছে।
এই উম্মাহর একজন রিজাল-উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। তখনও পর্দার আয়াত নাযিল হয়নি। তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.) এর কাছে গিয়ে বলছেন, ইয়া
রাসূলাল্লাহ! আপনার কাছে ভালোমন্দ সব ধরনের লোকেরা আসে। আপনি যদি আপনার স্ত্রীদের পর্দা করার আদেশ দিতেন। বাইরের কেউ উম্মুল মুমিনীদের দেখবে, উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে এটা পছন্দ হচ্ছিল না।
ওয়াল্লাহি, স্বয়ং আল্লাহ এরপর পর্দার বিধান নাযিল করে আসমান থেকে কুরআন পাঠালেন (সূরাহ আযযাব এর ৫৩ নং আয়াত)। নবি নয়, উম্মাহর একজন সত্যিকারের রিজাল, একটা মতামত দিয়েছেন, যার সমর্থনে স্বয়ং আল্লাহ কুরআন নাযিল করেছেন। এমনই ছিল উম্মাহর পুরুষেরা। তারাই ছিল Real man!
এই উমর ইবনুল খাত্তাব এর মৃত্যুর পর, রাসূল (সা.) এবং আবু বকর (রা.) এর পাশে তাকে দাফন করা হয়। উমরের মৃত্যুর আগে আইশা (রা.) যখন নবিজির কবরের কাছে যেতেন, পর্দা করতেন না, কারণ নবিজি (সা.) এবং পিতা আবু বকর (রা.) দুইজনই তাঁর মাহরাম ছিলেন।
কিন্তু উমর (রা.) কে যখন সেখানে দাফন করা হয়, এরপর থেকে আইশা (রা.) পর্দা করে কবরের কাছে যেতেন। উমর ইবনুল খাত্তাবের প্রতি মানুষের সমীহ এই পর্যায়ের ছিল যে, তাঁর মৃত্যুর পর কবরের কাছে গেলেও একজন সতী নারী পর্দা করে যেত। এরাই ছিল উম্মাহর পুরুষ। এরাই উম্মাহর নারীদের আগলে রেখেছিল।
উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) বলেন, আমি একবার রাসূল (সা.) এর নিকট ছিলাম। উন্মুল মুমিনীন মায়মুনা (রা.) ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় আবদুল্লাহ ইবনু উম্মে মাকতুম উপস্থিত হলেন। এটি ছিল পর্দা বিধানের পরের ঘটনা। তখন রাসূল (সা.) বললেন, তোমরা তার সামনে থেকে সরে যাও। আমরা বললাম, তিনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখছেন না! তখন রাসূল (সা.) বললেন, সে অন্ধ ঠিক আছে, কিন্তু তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছ না?(১)
আরেকবার তো একজন আলিম আমাকে (Mohammad Hoblos) বলছেন, ভাই! আপনার দাওয়া ভিডিওতে নারীদের আনেন না কেন? আপনার উচিত নারীদেরকেও নিয়ে আসা! আমি বিস্মিত, হতবাক হয়ে চেয়ে আছি, এ কী বলছেন আপনি! আচ্ছা, আপনি মেনে নেবেন আপনার স্ত্রী আমার সাথে বসে খোশগল্প করছে, হাসাহাসি করছে, আর সেটা ভিডিও হচ্ছে, সারা দুনিয়ার মানুষ দেখছে?
আমাদের নারীরা 'হায়া' হারানোর আগে উম্মাহর পুরুষরা তাদের হায়া হারিয়েছে। হায়া, এটা কোনো সহজ বিষয় নয়। সমস্ত ইংরেজি ভাষায় এমন কোনো শব্দ নেই, যেটা এই 'হায়া' শব্দটার যথার্থ অর্থ প্রকাশ করতে পারে! ওলামারা বলেন, যার অন্তরে হায়া নেই, তার মরে যাওয়াই শ্রেয়।
নবিজি (সা.) একদিন আইশা (রা.) এর সাথে ছিলেন। বিশ্রাম করছিলেন, তাই একটু রিল্যাক্স ভঙ্গিতে বসা ছিলেন। এতে তাঁর পায়ের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল। এমন সময় দরজায় কেউ একজন কড়া নাড়ল। আইশা (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা আবু বকর (রা.) এসেছেন। রাসূল (সা.) যেভাবে ছিলেন, সেভাবেই থাকলেন, বললেন আবু বকরকে ভেতরে আসতে দাও। আবু বকর ভেতরে এলেন। কিছুক্ষণ পর আবার কেউ দরজায় করা নাড়ল। আইশা (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এসেছেন। এবারও রাসূল (সা.) যেভাবে ছিলেন সেভাবেই বসে থাকলেন, উমর (রা.) কে ভেতরে আসতে বললেন।
এর কিছু সময় পর আবার কেউ দরকায় কড়া নাড়ল। আইশা (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উসমান ইবনু আফফান এসেছেন। রাসূল (সা.) নড়েচড়ে বসলেন, কাপড় ঠিক করলেন, পরিপাটি হয়ে নিলেন, অতঃপর বললেন, এবার উসমানকে আসতে বল।
রাসূল (সা.) এর এই আচরণ দেখে আইশা (রা.) এর একটু কৌতূহল হলো। তাই তাঁরা তিনজন চলে যাওয়ার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবু বকর এলো, উমর এলো, আপনি যেভাবে ছিলেন সেভাবেই বসে থাকলেন, কিন্তু যখন উসমান এলো আপনি এভাবে পরিপাটি হয়ে, গায়ে কাপড় দিয়ে বসলেন কেন? জবাবে রাসূল (সা.) বললেন, আইশা! আমি কি এমন ব্যক্তিকে লজ্জা করব না, যাকে দেখে স্বয়ং ফেরেশতারা পর্যন্ত লজ্জা পায়!
এরাই হলো উম্মাহর সেই পুরুষ, যাদের অন্তরে হায়া ছিল, গীরাহ ছিল, পৌরুষ ছিল। তাই তাঁরা তাদের অধীনস্ত নারীদের আগলে রাখতে পেরেছেন। উম্মাহকে জুড়ে রাখতে পেরেছেন। আর আজ উম্মাহ তার পুরুষদের হারিয়েছে, সেই সাথে নারীরাও বিপথে চলেছে। এই উম্মাহকে আবার তার আগের অবস্থায় জুড়ে দিতে হলে, আগে এই উম্মাহর পুরুষদের সত্যিকারের 'পুরুষ' হয়ে উঠতে হবে।
--------------------------------------------------------
[১] সুনানে আবু দাউদ ৪/৩৬১, হাদিস: ৪১১২; তিরমিযি ৫/১০২, হাদীস: ২৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ ৬/২৯৬; শরহুল মুসলিম, নববি ১০/১৭; ফাতহুল বারী ১/২৪৮
- "এপিটাফ" বই থেকে।
©