20/10/2024
একদম নিউট্রাল মাইন্ড থেকে না পড়তে পারলে পোস্টটা না পড়ার অনুরোধ। এই পোস্টটা তাদের জন্যই যারা একপাক্ষিক নিজেদের কথা না ভেবে মুদ্রার অপর পিঠেও দেখবেন৷ এবং যাদের মধ্যে সবার আগে নিজেকে শুধরানোর মানসিকতা আছে।
সেদিন একটা পোস্টের স্ক্রিনশট আমার সামনে আসলো। পোস্টটি সম্ভবত কোন ভাইয়ের। তো ভাইয়ের কথা বলার আগে তার স্ত্রীর সম্ভাব্য কথাটা বলি।
যদি এই জায়গায় তার স্ত্রী থাকতো তাহলে আমরা গার্লস গ্রুপগুলোতে পোস্ট দেখতাম, - আমার কোন স্বাধীনতা নাই৷ আমাকে আমার মত করে শখের কিছু করতে দেয় না চলতে দেয় না৷ তার মতের বিরুদ্ধে কিছু হলেই খুব বাজে ব্যবহার করে। এমন মানুষের সাথে থাকতে থাকতে জীবনটা শেষ হয়ে গেল। আমার দম বন্ধ লাগে। কোন আমল আছে আপুরা? এমন রগচটা খারাপ মানুষের সাথে কিভাবে থাকে মানুষ?
- এখানে আমরা কী করতাম ভাইটাকে ধুয়ে দিতাম, বোনকে ধৈর্য ধরতে বলতাম৷ ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু৷ বিয়ে নিয়ে ভয় কাজ করত, পুরুষ জাতির গুষ্টি উদ্ধার করে ফেলতাম। আরো বলতাম এক বউয়ের সাথেই ঠিক ব্যবহার করে না আবার ৪ জনের স্বপ্ন দেখে।
এবার আসি ভাইয়ের কথায়-
উনার পোস্টে ৩ টি ঘটনা উল্লেখ করেছেন তিনি৷ সারমর্ম এমন যে, ৬-৭ ঘণ্টার জন্য, বাসে করে অচেনা শহরে রাতের জার্নিতে একা যেতে তার স্ত্রীকে ভাইটি নিষেধ করেছিলেন যে, এখন থাক পরে আমি ছুটি পেলে নিয়ে যাব। তোমার নিরাপত্তার চেয়ে অন্য কিছুই বেশি জরুরি না। কিন্তু স্ত্রী স্বামীর কথা মানে নি। জোর করেছে সে যাবেই। এতে ভাইটি রেগে যেয়ে বকাবকি করেছেন।
২য় ঘটনায়, যেহেতু মেয়েটি যাওয়ার জন্য জেদ করেছেই, যাওয়ার আগে ভাইটি স্ত্রীকে বলেছেন বাসা থেকে অবশ্যই কিছু খেয়ে বের হতে নাহলে সারা রাস্তায় শরীর খারাপ লাগবে। কিন্তু এখানেও তার স্ত্রী তার কথা শুনে নি৷ তখন ভাইটি লাউড ভয়েসে বকাবকি করেন
সেই পোস্টে ভাইটি অত্যন্ত অনুতপ্ততার সাথেই বলেছেন, উনি যখন কিছু করতে বলেন, বা কোন কিছু নিষেধ করেন, বা যা পছন্দ করেন না তা করা হয় তিনি মানা করলেও তার স্ত্রী শুনেন না এবং তখন তিনি রেগে যেয়ে সেইম নরমাল কথাটাই লাউডলি বলে ফেলেন।
উনি দ্বীনি ভাইদের কাছে সমাধান চেয়েছেন যে কিভাবে প্র্যাক্টিস করলে উনার আখলাকের এই সমস্যাটা শুধরাতে পারবেন। নিজের অনিচ্ছাতেও স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছেন বলে উনি নিজেও কষ্ট পাচ্ছেন।
বুঝলেন কিছু? মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ?
এখানে আমি বাস্তবিক অর্থে ভাইটির কোন দোষ দেখি না।
আমার কথা মেনে নেওয়া জরুরি না। শরিয়ত কী বলে? স্বামীর সকল হালাল চাওয়া আমাদের জন্য শিরোধার্য। স্বামীর সকল হালাল আদেশের আনুগত্য আমাদের জন্য ফরয। না মানলে? কবীরহ গুনাহ নাকি সগীরহ গুনাহ?
নামায যেমন ফরয, পর্দা যেমন ফরয, তেমন স্বামীর প্রতি আনুগত্যকে কি আমরা ফরযের মত করে পালন করি? শারিরীক মানসিক চাওয়া পাওয়া, পছন্দ অপছন্দ- সবকিছুকে কি আমরা আপন করে নেই? রাসূল(সা) যে মানুষটার কথা বলেছেন, অনুমতি থাকলে আল্লাহর পরে তাকে সিজদা করার কথা বলা হতো, আমরা সেই মানুষটাকে কতটুকুই বা সম্মান দেই?
আমরা দেখি মা খাদিজা(রা) এর মৃত্যুর আগে অব্দি নবীজি ﷺ একজন নিয়েই সুখী ছিলেন। আমরা এটা কেন দেখি না যে, আল্লাহর পরে এই স্বামীর পদতলেই মা খাদিজা নিজের সব উৎসর্গ করেছিলেন? (আমাদের জন্য, আল্লাহ ও তার রাসূলের পরে)। মা খাদিজার আনুগত্য, ত্যাগ, সবরের কথা উঠলে আমরা বলি, পুরুষরা তো রাসূল(সা) এর মত না।
তাহলে, মা খাদিজার জীবনের প্রথম অংশের কথা কী বলবেন? আসমান থেকে নূর আসার স্বপ্ন দেখারও প্রায় ১৫-২০ বছর আগেও উনার প্রথম দুই ঘরেও ছিলেন তিনি প্রশান্তি উৎস৷ মা খাদিজা যখন প্রথম বিয়ে করে স্বামীর ঘরে যান। সবাইকে জয় করে নেওয়ার মূলমন্ত্রই ছিল আনুগত্য ও সবর। খাদিজা(রা) ৩ জন স্বামীই তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। কিভাবে ছিলেন? কেন ছিলেন?
আমরা কথার পিঠে কথা অনেক বলতে পারি৷ আজ আমি কোন উত্তর শুনতে চাই না৷ আজ শুধু নারীমহল নিয়েই কথা হবে। নারীদের ভুল ত্রুটি এবং সংশোধন ও করণীয় নিয়ে কথা হবে।
আমার লিস্টের একজন বললেন, এক নারীতে আসক্ত পুরুষই সবচেয়ে সুন্দর। আসলেই কি তাই? কথাটা সম্পূর্ণ পরিমাণে ইসলামের সাথে যায়?
আল্লাহ তা'আলাই পুরুষকে বহুগামী ফিতরাত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। ফিতরাতের বিরুদ্ধে, আল্লাহর সৃষ্টির বিরুদ্ধে সৌন্দর্য দাড় করিয়ে দিলে কি হবে? এটাই যদি সুন্দর হয় তাহলে তালাকপ্রাপ্তা, বিধবাদের কী হবে? উম্মাহ ও দ্বীনের প্রয়োজন কী হবে? বরং সবদিক বিবেচনায় পুরুষের বহুগামী ফিতরাতই ইসলামের সৌন্দর্য।
আল্লাহ যেমন বিধান ও ফিতরাত দিয়েছেন তেমন তিনি ব্রেইন ফাংশনও দিয়েছেন একাধিকজনকে ভালবাসার ক্ষমতা। একজনকে ভালবাসবে আরেকজনকে বাসবে না- এমন অন্যায়, বেইনসাফি আল্লাহ করেন নি, করবেন না।
যে পুরুষ নিজে বেইনসাফ সে একমাত্র নারীর সাথেও করে৷ একমাত্র স্ত্রী হয়েও বা কতজন নারী সুখে আছে? আমাদের সামনে কি কম উদাহরণ আছে? কত পুরুষরা দেশের বাইরে স্ত্রীর ঘুরতে যাওয়া, পড়তে যাওয়াকে সায় দেয়, হেল্প করে, স্ত্রী বড় চাকরিতে খুশি হয়, স্ত্রীর মডেলিং এ খুশি হয়৷ আদতে তারাও এক স্ত্রীতে আসক্ত৷ কিন্তু এমন পুরুষ কি আদৌ সুন্দর? এরকম জঘন্য পুরুষ আর হতে পারে?
হ্যাঁ, আমি বলছি না পুরুষের কোন ভুল নেই। অনেক পুরুষই খারাপ। তারা জালিম, বেইনসাফ। কিন্তু কোন মানুষ ভুল করলে সেটা তার নিজের ভুল। সেই ভুলের বিপরীতটা সৌন্দর্য সবসময় না৷ দুনিয়ার সব পুরুষ মিলেও যদি না ইনসাফি করে সেটা তাদের নিজের আমল, ইসলামের সৌন্দর্য তাতে নষ্ট হয় না। বিগত সালাফ আস স্বলেহীন, বুজূর্গ উলামায়ে কিরাম, এমনকি সাহাবীদেরও জীবনের বড় একটা অংশের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায় না।
আমরা পুরুষের কথা বেশি বলতে পছন্দ করি, তাই না? নিউজফিডে শুধু আয়াত ও হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে পুরুষের করণীয়ই ঘুরে, রোমান্টিক গল্প ঘুরে, গার্লস গ্রুপগুলোতে মেয়েদের আহাজারির আস্তানা। সেক্যুলার বিশ্বাসগুলো বেশি ধারণ করতে আমাদের নাফস আনন্দ পায়।
কিন্তু আমরা এক স্বামীর কথা বলি না৷ একটা মাত্র স্বামীর প্রতি আমরাই বা কতখানি হক্ক্ব আদায় করি? শারিরীক ও মানসিকভাবে সুকুন দেই? স্বামীর চক্ষুশীতলকারী হতে সর্বোচ্চ দিয়ে দেই?
সবকিছুতে সব টপিকে আমরা টেনে আনি- পুরুষের চাহিদা কেন বেশি? বাচ্চা হয়ে এটা হইসে সেটা হইসে, আমার অভিমান আমার অভিযোগ, আমার কষ্ট কেউ বুঝে না৷ এগুলাই আমরা বলি। আমরা ইনসাফ চাই হক্ক্ব চাই,খুব ভাল বুঝি এসব।
কিন্তু স্বামী আগলে রাখার সংজ্ঞা নিয়ে কেন কথা হয় না? আমরা কজন স্ত্রী স্বামীর ভাল বন্ধু? স্বামীর সব জখমের আশ্রয়কেন্দ্র? কজনের স্বামী অনুভব করে যে সব ঝামেলার পরে ঘরে একজন আছে অপেক্ষায় যেখানে ফিরে শান্তি পাব, যে আমাকে আমার মত করে বুঝবে৷ আমরা কজন আমাদের স্বামীকে এটা ফিল করাতে পারি? এগুলো নিয়ে কেন কথা হয় না? স্ত্রীর সৌন্দর্য স্বামীর প্রতি তার আনুগত্যে, সবরে, ত্যাগে - এটা কেন ৫০% ও হাইলাইট হয় না?
স্বামীরা যেন রোবট! তারা কিছুই করতে পারে না। আমাদের অভিমান অভিযোগ কিছুই বুঝে না। আমরা বুঝি তাদেরকে? কখনো ভেবেছেন আপনি যখন বাচ্চা জন্ম দিচ্ছেন তখন আপনাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার ভয় তার মনে ধরেছিল কিনা? ধরলেও কি পুরুষ মানুষ প্রকাশ করবে? আপ্নারা অভিযোগ করেন বাচ্চা হওয়ার পরে আর সে আকর্ষিত হয় না৷ কখনো ভেবেছেন বাচ্চা হওয়ার পরে আরো বেটার ইনকামের জন্য তার ভিতরের পেরেশানিটা কতটুকু? ব্যবসার লস বা বসের ঝাড়ি সামলে এসে বাসায় ঢুকে তার শরীর কেমন লাগে?
আমরাই শুধু বাচ্চা সামলে কাইত হয়ে থাকি, ঘর অগোছালো থাকে, শরীরটা কাজের বুয়া হয়ে থাকে, কাপড় ধোয়া ঘর মোছা বাকি থাকে। আবার আমরাই চাই তারা বাহির থেকে এসে বাচ্চা ধরে না কেন!
আমরা উদাহরণ দেই রাসূল ﷺ ঘরের কাজ করতেন। কখন করতেন? হ্যাঁ, কখন করতেন? মাদানি জীবনে করতেন। মাক্কী জীবনে না!
মাক্কী জীবনে মা খাদিজা অন্তত তার ঘরে আমার রাসূলের গায়ে একটা আচড়ও পড়তে দেন নি। তিনি হয়েছেন রাসূলের ﷺ স্বস্তি ও আরামের জায়গা।
আমি যখন চাইব আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমি আমার স্বামীর জন্য সব করব। তখন কি তার কাছে আমার আর কোন আশা থাকবে? না থাকবে অভিমান অভিযোগ? আমি এক আপুকে চিনি, যিনি হাজার সমস্যা অসুস্থতা থাকলেও স্বামীর সামান্য আবদারেও উঠে পড়েন- শুধুমাত্র এই স্বভাবের জন্য উনার স্বামী উনার জন্য পাগল৷ আর আমরা কী করি? আমরা করতে পারি অভিযোগ৷ আমার অসুস্থতা দেখল না, নিজেও তো করতে পারে, আমি কষ্ট করে এতকিছু করি সে মায়া করে না৷ হেন তেন, কত অভিযোগ, কত অভিযোগ!
আপনারা বিশ্বাস করতে পারবেন না আমার ইনবক্সে আমি এই পর্যন্ত কতজনকে ঠেলে ঠেলে বলেছি এখন সাজেন এভাবে সাজেন, এখন ফোন না গুতিয়ে স্বামীর কাছে যেয়ে এভাবে ফুসলান ইত্যাদি ইত্যাদি৷
হ্যাঁ, আবার এমন অনেক দেখেছি ওয়াহিদা মাসনার একে অন্যের বাসায় যাওয়া আসা, বাচ্চাদের খেলাধুলা - কী মধুর সম্পর্ক। স্বামীর প্রশংসায় উভয়েই পঞ্চমুখ।
আমার এক আত্মীয়ের গল্প আমি অনেক বোনদের বলি৷ সেই আত্মীয়, স্ত্রীর একটা ভুলে রেগে, বিদেশ চলে গেছিলেন না জানিয়েই৷ পরবর্তীতে পরিবারের অন্য সবার সাথে যোগাযোগ করলেও স্ত্রীর সাথে করেন নি৷ অনেক দিন হওয়ার পরে, আশেপাশের মানুষ বলে, ছেড়ে দিসে হয়ত, আরেক মেয়ে পাতাইসে তুমি চলে যাও ইত্যাদি৷ কিন্তু সেই আত্নীয়া বাবার বাড়ি যেত ঈদ পরবে ২-৩ দিনের জন্য৷ বাকি সময় এক ছেলে নিয়ে শাশুড়ি, জা এর খিদমতেই ছিলেন।
এভাবে ক বছর গেছে জানেন? ৯ বছর! একদিন হঠাৎ, সেই আত্মীয় বাসায় ফোন দিয়ে স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চান। শুধু এটুকুই বলেন যে, ইংলিশ শিখে ফেল, আমি কাগজপত্র রেডি করছি৷ এরপরেই দেশে এসে স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলে যান। সেই আত্মীয়ার সবর ও ত্যাগের সামনে তার স্বামী মাথা ঝুকে পায়ের কাছে পড়ে মাফি চেয়েছেন। আর এখন? এখন বিয়ের ৩৭ বছর পরেও তিনি আজও স্ত্রী বলতে পাগল।
আসলে বলতে গেলে শেষ হবে না। অনেক অনেক কিছু বলতে পারব। আমার কথার মূলকথা হচ্ছে, আমরা আগে নিজেদের হিসাব মিলাই আসুন, যে আমরা কী করতে পারলাম না? যা পারলাম না তা চেষ্টা করতে থাকি৷
চারটা কথা সবসময় মনে রাখবেন।
১. মারাত্মক লেভেলের জালিম না হলে যেমন আমার প্রাক্তন ছিল- গায়ে হাত পা তোলা, খেতে পরতে না দেওয়া, চারিত্রিক অপবাদ দেওয়া, মাসের পর মাস মাহরুম রাখা - ইত্যাদি পরকিয়া, নেশা এসব না থাকলে,
"আনুগত্য, সবর ও ত্যাগ" ই সংসারের মূলমন্ত্র!
২. আল্লাহ কখনো নিরাশ করেন না।
৩. আল্লাহ নিশ্চয়ই সবরকারীদের সাথে আছেন।
৪. যা করব, বলব, ভালবাসব- সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
আর করব আমরা দু'আ। ঈমানি মৃত্যু, উত্তম সন্তান, বরকতময় রিজিক, মাকবুল আমল - এর সাথে চাইব- স্বামীর সন্তুষ্টি, স্বামীর ভালবাসা, আর, নিজে যেন স্বামীর উত্তম চক্ষুশীতলকারী স্ত্রী হতে পারি, স্বামীর সুকুম হতে পারি। তিন বেলা ভাতের মত প্রত্যেক দুয়া কবুলের মুহূর্তে এই দুয়া নিজেদের জন্য বাধ্যতামূলক করে নিব আমরা ইন শা আল্লাহ
আল্লাহ সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন।
আমার নামটা ধরে খাস করে দু'আ চাই। কিছু পরীক্ষা ও পেরেশানির মধ্যে যাচ্ছি আমি ও আমার পরিবার।
পোস্টটি বেশি বেশি কপি ও শেয়ার করার অনুরোধ।
(অবশ্যই আমার নামসহ)
© Zainab Binte Abdur Rahman