03/05/2025
আমাদের পাখিওয়ালা বাড়ি🕊️🏘️
ভিডিও সাক্ষাৎকারে আমার বাবা🤍
আমার দাদাজানের জীবন্ত স্মৃতি 💌
✍️সায়মা কবির সুরমা
দিস ইজ নট অ্যামাজন,
ইহা
আমাদের বাড়ির পিছন!👀
ঐ যে দেখছেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটা!
ঐ গাছ সহ আরও পুরোনো ৩টা গাছ ভরা ৪ রকমের পাখিদের আবাসস্থল!আর এ কারণেই আমাদের বাড়ি মাস্টার বাড়ির সাথে পাখিওয়ালা বাড়ি নামেও বেশ সুপরিচিত🖤
তাদের দেখাশুনাকারী বিশ্বস্ত আশ্রয়দাতা ছিলেন আমার মরহুম দাদাজান আলহাজ্ব মফিজুর রহমান!৩টি পুরোনো গাছ তিনি কেবল পাখিদের আশ্রয় দেবার জন্য যত্নে আগলে রেখেছিলেন,নিজে কাটেননি তার উত্তরসূরীদেরকেও কাটতে নিষেধ করে গেছেন!পশুপাখির প্রতি দাদুর ভালোবাসা দেখে বড় হয়েছি!কখনও গাছ ভরা পাখি থাকা স্বত্বেও পাখি নিজেরা শখ করে ধরে খেতে পারি তো নাই, কাউকে পাখি ধরতে মারতেও দেননি।চুরি করে কেউ ধরলে মারলে ধরা পড়লে তাকে শাস্তি দেয়া হতো।কতো চোর ধরা দেখেছি শৈশবে!দূর দূরান্ত থেকে মানুষ পাখি দেখতে আসতো ব/ন্দু/ক নিয়ে আসতো পাখি মারতে।পাখি ধরতে মারতে দেয়া কঠোরভাবে নিষেধ,সে যেই হোক যতবড়ো স্ট্যাট্যাসওয়ালাই হোকনা কেনো পাখি মারলে তার খবর খারাপ!চুরি করে পাখি মারলে যতক্ষণ চোর স্বীকারোক্তি না দিতো আর জীবনেও পাখি মারতে আসবেনা অন্যদেরকেও সতর্ক করে দিবে, ততক্ষণ তাকে ছাড়া হতোনা।যদি এ শাস্তি না দেয়া হতো, তবে সবাই পাখি ধরে মেরে খেয়ে ফেলতো।পাখিরা কখনোই আর আশ্রয় নিতোনা।
আমাদের শৈশব জুড়ে সবাই দেখে আসছি গাছভরা পাখি!পরিবারের অংশ হিসেবে পাখিগুলোকেও দাদু ভালোবেসে স্থান দিয়েছেন।ঝড় বৃষ্টি হলে যেখানে আশেপাশের প্রতিবেশী সবাই খুশিতে ওত পেঁতে থাকতো পাখি পড়লে ধরবে, খাবে, সেখানে দাদুকে দেখতাম চিন্তিত মলিন মুখে।পাখির বাসা গুলো ঝড় বৃষ্টিতে ভেঙ্গে যাবে,পাখি গুলো আঘাত পাবে পড়লে, একারণে দাদু ঝড়বৃষ্টির রাতে চিন্তায় ছটফট করতেন আর দুয়া করতে করতে পায়চারি করতেন, যেনো পাখিগুলোর ক্ষতি না হয়।কখনো ঝড়ে পাখি,পাখির বাচ্চাছানা আর ডিমগুলো পড়ে যাওয়া দেখে দাদুর কষ্ট আর আফসোসের রেখা চেহারায় ফুটে উঠতো দেখতাম!দাদুকে যদি বলতাম- দাদু আশেপাশের মানুষ গাছ থেকে পাখি পড়ে গেলে ধরে নিয়ে যেয়ে খায় আর আমরা পাখি পেয়েও ছেড়ে দেই!কেনো পড়ে যাওয়া বা ঝড় বৃষ্টি হলে বাসায় ঢুকে পড়া পাখিগুলোকেও আমাদেরকে ধরে খেতে দিতে চান না?!দাদু বলতো-ওরা অবলা জাত!ওরা বিশ্বাস আর ভরসা করে আমাদের এখানে আশ্রয় নিয়েছে আমরা ওদের আশ্রয়দাতা। আশ্রয়দাতা হয়েই যদি ওদের ক্ষতি করে ধরে খাই সুযোগ পেলেই! তবে ওরা আর আমাদের বিশ্বাস ভরসা করতে পারবেনা।এমন করলে একসময় আমাদের জায়গা ছেড়ে সব পাখি চলে যাবে!দাদুর কথা তখন না বুঝলেও এখন বুঝি সত্যিই তাই!প্রতি রাত দেখতাম দাদু টর্চলাইট নিয়ে বাগানে টহল দিয়ে আসতেন কেউ চুরি করে গাছে উঠছে কিনা কিংবা সাপ বা বেজি অন্য প্রাণী গাছে উঠে কিনা!চোর বা ক্ষতিকর প্রাণী গাছে উঠতে ধরলে পাখিগুলো সব জোরে চিৎকার করতো। ঘুমের মধ্যে থাকলেও দাদু জেগে উঠতেন টর্চ আর লাঠি নিয়ে বাগানে চিন্তিত হয়ে ছুটতেন।সাথে কখনও আমাদের সবাইকে ডেকে তুলতেন লাইট লাঠি নিয়ে আমারাও পাখিদের চিৎকারে ছুটে যেতাম দাদুর কথায়।দাদু বাগানে গিয়ে টর্চ মারতেন আবার টিনের বেড়ায় বাড়ি দিতেন যাতে পাখিরা বোঝে তাদের মালকিন আশ্রয়দাতা তাদের রক্ষা করতে চলে এসেছে ভয় নেই!আমাদের আগেই আমাদের বাসার কুকুর পাখিদের চিৎকারে গলা ছেড়ে ডাকাডাকি করতো।দাদু ছুট দেয়ার সাথেই কুকুরও পেছন পেছন ঘেউঘেউ করতে করতে ছুটতো!দাদুর এক ইশারা এক ডাকেই কুকুর জঙ্গলের ভিতর তল্লাশি করতো!দাদুর টর্চের আলোও যেনো পাখিগুলোর চেনা।অবাক করার বিষয় দাদুর কথা টর্চের আলো পেলেই মনে হয় ওরা বুঝে যেতো তাদের আশ্রয়দাতা এসে গেছে আর ভয় নেই জেনেই তারা ততক্ষণাৎ চিৎকার বন্ধ করে চুপ হয়ে যেতো।কি অদ্ভুত মিরাকল ব্যাপার।
দাদু বলতো পশু পাখিরাও সব বুঝে কেবল বলতে পারেনা মানুষের মতো! আসলেই তাই!বাসার বিড়াল কুকুর পাখি সবার ভরসাস্থল একমাত্র দাদুই ছিলো। বাড়ির বিড়ালগুলোও দাদুর গা পা ঘেঁষে থাকতো। দাদু ঘুমালেই শীতের দিন রাতে কম্বলের ভিতর দিয়ে পায়ের কাছে এসে আরাম করে শুয়ে পড়তো।যেনো মনিবের পায়ে তাদের সব উম মাখা।দাদুর বিছানায় কতো বিড়ালের সাথে ঘুমিয়েছি।ছোটোবেলায় এক কোলে করে বিড়াল আর এক কোলে আমাকে নিয়ে দাদুর সাথে আমার একটা ছবিও দেখেছিলাম ফ্যামিলি এলবামে।বাসার কুকুর বিড়ালের খাওয়ার জন্য মাছ কাটা সব আলাদা রাখা হতো।আমি মাছ ভালোভাবে খেতে পারতাম না।দাদু বলতো কাঁটা ফেলিসনা চুষে খা আর আমার পাতে তুলে দে।কাঁটা গুলো সব একসাথে করে বিড়ালকে ভাত মেখে খেতে দিতেন। খেতে বসলেই পায়ের কাছে ঘুরাঘুরি করতো তিন চারটা বিড়াল।বিড়ালদের চেহারা দেখলেই বোঝা যেতো কতো যত্ন করা হয় তাদের।বাসার কুকুর(কুকুর পোষা হতো পাহারার জন্য তাকে আলাদা বাসার বাইরে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন,যেহেতু কুকুর নাপাক আর বাসা পাহারার কাজ ছাড়া শখ করে কুকুর পোষা জায়েজ নয় তাই কুকুরকে বাসার ভিতর জায়গা দেয়া হতোনা)। বাসার বিড়াল কুকুরকে কখনও আঘাত করতে নিষেধ করতো দাদু,কেউ আঘাত করে জখম করলে দাদু কষ্ট পেতো দেখতাম।বলতো অবলা প্রাণী ক্ষতি না করলে মানুষ আঘাত করে কেনো!দাদু দাদি মিলে বিড়াল কুকুরের ক্ষত সাড়াতে কতো কি করতো দেখতাম।ঘাঁ আঘাতপ্রাপ্ত জায়গায় ছাই দিতো চুপ করে কত কৌশল খাঁটিয়ে ভাত খেতে দিয়ে ক্ষত স্থানে ছাই দিতো,ঔষধ মাখিয়ে খেতে দিতো। কারণ দাদু বলতো ছাই পশু প্রাণীর ক্ষত ঘায়ের এন্টিসেপটিক!আসলেই তাই কি দ্রুত সেড়ে যেতো দেখতাম।দাদু বা আমরা বাসা থেকে বের হলে পেছেন পেছন একদম গাড়িতে ওঠা না অবধি কুকুর বিড়ালগুলোও যেতো!কি বিশ্বস্ত ছিলো ভাবলেই অবাক লাগে!অপরিচিত কাউকে দেখলেই চিৎকার করে অথচ আমাদের দেখলে সুরসুর করে পেছন পেছন এগিয়ে দিতে যায়!দাদুকে দেখলেই মাথা নিচু করে শুয়ে পড়ে যেনো শ্রদ্ধা জ্ঞাপন! আদর করে পা দিয়ে মাথাটা আলতো করে নেড়ে দিলে কেমন একটা আদরমাখা শব্দ করে মাথা নাড়িয়ে আরও শুয়ে পড়ে।
জানিনা দাদু এই হাদিসটা জানতেন কিনা। যে কেউ ফলদায়ক বা সবজির গাছ লাগাবে তা থেকে মানুষ কিংবা পাখি যদি আহার করে খায় বা ছায়া হিসেবে সে গাছের নিচে বসে আশ্রয় নেয় তবে তা উক্ত ব্যাক্তির নামে সদকায়ে জারিয়ার সাওয়াব হিসেবে লিখিত হয়।এই যে জন্ম থেকে দেখে আসছি এতো গাছ গাছালি তারপরও দাদু প্রচুর গাছ লাগাতেন।গাছের ফল সবজি আশাপাশের প্রতিবেশীরা তো খেতই সাথে গাছের পাতা গবাদিপশুদেরকেও খাওয়াতো আবার গাছের শুকনো পাত,ডাল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতো।শুধু কি তাই?! গাছ থেকে পড়ে যাওয়া পাখি কিংবা পাখিদের ধরে আনা মাছ দিয়েই আমাদের আশেপাশের গরীব প্রতিবেশীদের আমিষের চাহিদাও পূরণ হতো।ভাবলেই অবাক লাগে এসবকিছুর জন্য সাওয়াব যোগ হচ্ছে সাদকায়ে জারিয়া স্বরুপ!
সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছিলো দাদু মারা যাবার দিন।দাদি তখন ওজু করে ঘরে আসছে এমন সময় ফোন বেজে উঠলো।তিন দিন আগে দাদু স্ট্রোক করেন তাকে মেডিকেলে আই সি ইউ তে ভর্তি করানো হয়েছে।সবাই সেখানে!বাসায় সেদিন আমি আর দাদি আসরের সালাতের পর আমরাও যাবো মেডিকেল তখনই ফোন- দাদু আর নেই মারা গেছেন!দাদির হাত থেকে ওজুর পাত্র পড়ে গেলো দাদি কেঁদে উঠলেন ওরে ময়নারে তোর দাদু মারা গেছে!আর তখনই সব পাখিগুলো একসাথে চিৎকার শুরু করে পুরো আকাশজুড়ে ছোটাছুটি করে চেঁচাচ্ছিলো।এমন দৃশ্য আমরা কখনই দেখিনি।পুরে আকাশ জুড়ে সব পাখি চিৎকার করছে সব গাছ ফাঁকা। তাদের ছোঁটাছুঁটি চিৎকার শুনে দাদি আর আমি আরও জোরে কেঁদে উঠেছিলাম।দাদুর কথাটা মনে পড়লো পশুপাখি অবলা জাত ওরা সবই বোঝে কেবল আমাদের মতো বলতে পারেনা।সেদিন এ দৃশ্য বুঝিয়ে দিলো তাদের মনেও জানা হয়ে গিয়েছে তাদের মনিব বিশ্বস্ত আশ্রয়দাতা দুনিয়া ত্যাগ করেছেন।আর একারণেই হয়তো তারা অদ্ভুতভাবে পুরো আকাশজুড়ে চিৎকার করে উড়ছিলো।দাদু যেদিন মারা যায় সব পাখি সেদিন চলে যায়!এত কষ্ট লেগেছিলো।আমরা সবাই ভেবেছিলাম আর আসবেনা। এমন অনেক গল্প শুনেছি এমন পাখি যেই বাসায় আশ্রয় নেয় সেই বাসায় বয়োবৃদ্ধ কর্তা মারা গেলে পাখিরা চলে যায় আর আসেনা।কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে দাদুর মৃত্যুর তিন দিন পরে পাখিগুলো আবার ফিরে আসে।
আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি খুব একটা বুঝদার নই কিন্তু দাদুর মৃত্যুর সংবাদটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য লেগেছিলো!থ হয়ে গিয়েছিলাম।১০০ বছরেও কোনো রোগবালাই বিহীন স্ট্রং ফিট কর্মদক্ষ পরিশ্রমী দাদুকে দেখে আমরা কতো মজা করে বলতাম দাদু তার নাতিপুতির ঘরের বাচ্চাকাচ্চাও দেখবে ইন শা আল্লাহ!কিন্তু দাদু এভাবে হঠাৎ আচমকা সুস্থ সবল মানুষ মারা যাবেন আমরা কেউ কল্পনাও করিনি!এই ঘোর আমার এখনও কাটেনা! আমর এখনও বিশ্বাস হয়না দাদু মারা গেছেন!দীর্ঘ একমাস আমি হ্যালুসিনেশনে ছিলাম দাদু যখন বাসায় ফিরতো দাদুর পায়ের আওয়াজ ঠুকঠুক শব্দ করা সেই লাঠি আর গলার স্বর সব স্পষ্ট শুনতাম আমি।আমার এখনও মনে হয় দাদু মারাই যাইনি বেঁচে আছেন,তার রেখে যাওয়া আমাদের সব স্মৃতিজুড়ে!
আমার অশ্রুসিক্ত দুয়াগুলো দাদু কি শুনতে পান?জানিনা তবে তার রবতো নিশ্চয়ই সব জানেন এবং শুনেন আর দেখেন!প্রতিটি প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য কথা হৃদয়ে লুকানো অনুভুতিও তিনি ঠিকই জানেন!মানুষ বেঁচে থাকলে আমরা তাদের যথার্থ মর্ম উপলব্ধি করিনা,আমরা তাদের কতোটা ভালোবাসি তাও বলিনা বলতে পারিনা কখনোই!কেবল দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেই আমরা বুঝে উঠি মানুষটা আমাদের জীবনে কি ছিলো!অথচ তখন আর ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ থাকেনা!কি অদ্ভুত মনুষ্যজাত আমরা!দুয়া করি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমার দাদুর সমস্ত গুনাহখাতা মাফ করে দিয়ে তার কবরটাকে জান্নাতের একটুকরো বাগান বানিয়ে দিক!তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন!আর আমাদেরকেও মাফ করে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাগানে আমাদের সবাইকে বংশসহ একত্রিত করুন!সুম্মা-আমীন ইয়া রব!