09/10/2025
।। ছোটবেলার লক্ষীপূজো ।।
আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন গ্রাম-গঞ্জে বিদ্যুৎ মানেই ছিল দূঃস্বপ্নের নাম। দিনের শেষে যখন পশ্চিম আকাশে সূর্য লাল রঙমেখে অস্তে যেত, তখন সারা গ্রাম ঢেকে যেত এক অদ্ভুত অন্ধকারে। পুকুরপাড়ে ব্যাঙের গ্যাঙর গ্যাঙ ডাক, বাঁশবনের ভিতর ঝিঁঝিঁ পোকার টানা গুঞ্জন, সব মিলিয়ে গা ছমছমে এক গোধূলি নামত আমাদের ছোট্ট গ্রামে।
অন্ধকার নামলেই গ্রামের চেনা পথগুলো যেন হঠাৎ অপরিচিত হয়ে যেত। পুকুরের ওপারের বাঁশঝাড়গুলো কেমন যেন ঘুমন্ত দৈত্যের মতো মাথা নাড়ত হাওয়ার ছোঁয়ায়। তবু আমরা ভয় পাইনি— না, অন্তত ভয়কে জয় করেছিলাম শিশুমনের কৌতূহলে। পুজোর সময় বা কোনো গাঁয়ের অনুষ্ঠানে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়তাম আমরা, বাবামায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে।
সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিল লক্ষীপূজো। সেদিন গ্রামের প্রতিটি ঘরেই বাতাসে ভেসে বেড়াত ধূপের গন্ধ, সিঁদুরে মাখা আলপনা, আর প্রদীপের নরম আলো। আমরা তখন দল বেঁধে বেরিয়ে পড়তাম প্রসাদ খেতে— এক একটা বাড়ির আঙিনা থেকে অন্য বাড়ি পর্যন্ত এক অন্তহীন উৎসব। আমাদের হাতে থাকত নিজেদের বানানো “টর্চ”— অর্ধেক নারকেলের খোল, তার ভিতর মোমবাতি গোঁজা, আর পেছনে বাঁশের কঞ্চি। সেটাই ছিল আমাদের অন্ধকার ভেদিকা।
এক হাতে সেই টর্চের আলো, আর অন্য হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। যত বাড়িতে যেতাম, যত প্রসাদ পেতাম— বিশেষ করে নারকেলের নাড়ু— সব জমে উঠত সেই ব্যাগে। কত হাসি, কত গল্প, কত ছোট ছোট ঝগড়া! কিন্তু রাতের শেষে, যখন ফিরে আসতাম মাঠ পেরিয়ে, সেই নিঃশব্দ অন্ধকারে মনে হতো— যেন পুরো গ্রাম আমাদের সঙ্গে নিঃশব্দে হাসছে।
আজ যখন শহর-গ্রামে একসাথে লক্ষীপূজোর আলো ঝলমলে রোশনাই দেখি, তখন হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই পুরোনো দিনগুলো।
চোখ বন্ধ করলেই যেন স্পষ্ট দেখি—
কিছু কিশোর, হাতে নিজেদের বানানো টর্চ, ঘুটঘুটে অন্ধকার পেরিয়ে যাচ্ছে বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে,
আর দূরে কারও উঠোনে জ্বলছে প্রদীপের আলো,
সেই আলোর দিকেই ছুটে চলেছে তারা—
প্রসাদের থলি হাতে, আর বুকভরা নির্ভেজাল আনন্দ নিয়ে...!!
#লক্ষীপূজো