31/03/2026
|| মহিন্দর শ্মশানকালী ||
আড়াই কোদাল মাটি, হাঁসের ডিম, মদ আর মৃৎশিল্পী- এই দিয়ে মাতৃমূর্তি তৈরি হচ্ছে আর পুজোও হচ্ছে ধুমধাম করে নির্জন এক শ্মশান প্রান্তরে। ভুল বললাম, যদিও আজ সেই নির্জনতা নেই। তবু এসব শুনলে গা ছমছম করেই। আজকে বলছি মাতৃ আরাধনার অন্য একটি দিক নিয়ে, পূর্ব বর্ধমানের জৌগ্রামের মহিন্দর শ্মশানকালী পুজো নিয়ে।
বাংলা ক্যালেন্ডার লক্ষ্য করলে দেখবো আজ ১৬ই চৈত্র - আজকের এই বিশেষ দিনে প্রতিবছর হয় মহিন্দর শ্মশানকালী মায়ের আরাধনা। লোকমুখে শোনা যায় এই পুজোর বয়স প্রায় ৩০০-৪০০ বছর! আর প্রতিবছর এই ১৬ই চৈত্র মায়ের আরাধনা তিথি।
বাংলার ফাল্গুন -চৈত্র নিয়েই বসন্তকাল, মনোরম এই সময়ে রোগের প্রাদুর্ভাব কম হয় না, এরকমই এক সময়ে কলেরার প্রকোপ বাড়ে গ্রামে। স্বপ্নাদেশ ও অন্যান্য গুরুর পরামর্শ মতো শুরু হয় মায়ের আরাধনা - উদ্দেশ্যে রোগ প্রকোপ দূর করা। এখন এইরকম উদ্দেশ্যেই বাংলায় বহু জায়গায় বছরের বিভিন্ন সময়ে রক্ষাকালী পূজা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রেও মনে হয় সেইভাবেই পুজো শুরু হয়।
একে শ্মশানকালীপুজো, সাথে শ্মশানে পুজো, সাধারণ মানুষের বুকে ভয় ধরাবেই। যে কোনো সাধারণ ব্রাহ্মণ পুজো করতে চাইলেন না। এগিয়ে এলো রায়না গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবার, মায়ের পুজোর দায়িত্ব নিলেন। তখন থেকে বংশপরম্পরায় তারাই পুজো করে আসছেন। এক্ষেত্রে প্রধান উপাসক নিজেদের গৃহদেবী রাজেশ্বরীর রূপেই পুজো করেন।
এখন মায়ের মূর্তি দেখি, মা এখানে আড়াই-তিন ফুটের। দ্বিভুজা, মায়ের জিভ দেখা যায় না। মায়ের গাত্রবর্ণ ঘোর কালো। শিবের উপর দণ্ডায়মান। বাম হাতে পাত্র, অপর হাত আশীর্বাদ দানের মত থাকে, মুণ্ডও থাকে বলা হয়। কিন্তু কোনো ছবিতেই আমি সেই অর্থে দেখতে পাইনি। মায়ের কোমরে সামনে বাঘছাল জাতীয় আচ্ছাদন আছে। মূর্তি তৈরি হয় পুজোর দিন সূর্য পাটে বসলে। মূর্তি তৈরি হয় মদ, হাঁসের ডিম আর আড়াই কোদাল মাটি দিয়ে। মূর্তি তৈরি করে যা পূজার স্থানে নিয়ে আসা হয় । এক ব্যক্তি মাকে মাথায় বসিয়ে মাতৃ মূর্তি নাচাতে নাচাতে নিয়ে আসেন। এই মূর্তি কিন্তু গৃহস্থ দক্ষিণাকালীকার মত নয়, বর্ণনা দেখলে সহজেই বোঝা যায় এটি শ্মশান কালী।
মাকে ভোগ দেওয়া হবে একটি নির্দিষ্ট পুকুর থেকে সংগ্রহ করা মাছ, অবশ্যই পুড়িয়ে। সারারাত ধরে পুজো চলে। মায়ের পুজো এখানে বীরাচার মতে। পূর্বে এই পুজো নির্জন শ্মশানে হত। এখন জনপ্রিয়তা বিপুল। বহু মানুষ আসেন এই পুজো দেখতে, রীতিমতো আলোকসজ্জা করা হয়। যিনি পুজো করবেন তিনি মহিলাদের মত সাদা-লালপাড় শাড়িও পরেন।
নীতি অনুযায়ী সূর্যোদয়ের পূর্বে মায়ের বিসর্জন হবে। সেইমত দুইজন ব্যক্তি মাকে নিয়ে চলে যাবেন পাশের গ্রাম দোগাছিয়ার তালপুকুর পাড়ে। লক্ষণীয় অন্য কেউ যাবে না মূর্তির সাথে। যাবেন এই দুজন। তারা মাতৃ মূর্তি পুকুরের পাড়ে নামিয়ে সম্পূর্ণ অন্য পথ ধরে ফিরবেন। ফিরে তাকাবেনও না। মানুষের বিশ্বাস মা নিজেই পুকুরে নেমে যান।
মা খুবই জাগ্রত, যেই কারণের জন্য পুজো শুরু হয় সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। মায়ের মহিমা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শ্মশানে হওয়া যে পুজো মানুষ আগে ভয়ে যেত না, আজ হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে পুজো জমজমাট। এটা মায়ের কৃপা নয়তো কি?
আজ মায়ের পুজোর দিন, যদি যেতে চান, হাওড়া বর্ধমান কর্ড লাইনে ট্রেনে করে জৌগ্রাম স্টেশন । সেখান থেকে টোটোয় করে পূজার মূল জায়গায় যাওয়া যাবে। আর যেতে না পারলেও অসুবিধা নেই। মাকে অন্তরের ভক্তি দান করুন, মাকে স্মরণ করাটা জরুরি।
আজকাল মানুষ পুজোর স্থানে গিয়ে পুজোয় মনোযোগের চেয়ে ভিডিও করায় মনোযোগ বেশি দেন। ভিডিও করায় বাধা আসলেই তুমুল ঝামেলা করেন। এতে করে সাবস্ক্রাইব এর ঘণ্টা আইকন প্রেস হয় আর ভক্তির ঘণ্টা হয়। এর থেকে ভালো অন্তরের ভক্তি নিয়ে বাড়ি বসে মাকে ডাকা। ভক্তি অটল থাকলে মা ডাকে সাড়া দেবেন- আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি।
জয় মা! সকলের মঙ্গল হোক।
#সংগৃহীত