20/10/2025
#অচেনা_স্পর্শ_চেনা_স্বপ্ন
#পর্বঃ১
#রিমঝিম_রিম
🌌💭✨
হঠাৎ করে পিছন ঘুরতেই মনে হলো কোনো শক্ত কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেলাম। ভয়ে আমার চোখ বন্ধ হয়ে গেল, আর ভাবলাম, "এখানে তো ফাঁকা ছিল... কিসের সঙ্গে ধাক্কা খেলাম?" এমনটা ভাবতে না ভাবতেই খুব কাছে একটা ভারী, তীক্ষ্ণ পুরুষালি কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
"স্টুপিড গার্ল... কতক্ষণ লেগে থাকবেন? সরুন, ছেলে দেখলেই গায়ে পড়া স্বভাব দেখছি।"
কণ্ঠস্বর শুনেই আমার মেজাজটা সপ্তমে চড়লো। আমি এক ঝটকায় সরে দাঁড়ালাম, চোখ খুলে দেখি, এক পেশীময় শরীর নিয়ে যুবক দাঁড়িয়ে আছে। তার পেশিবহুল শরীর দেখে মনে হলো, মাথা ফুলে ঢোল হয়ে যাবে।
আমি ক্ষিপ্ত হয়ে বললাম, "মুখ সামলে কথা বলুন মিস্টার... আমি আপনাকে ধাক্কা মেরেছি না আপনি এসে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছেন? এখন আপনি আমাকেই এতো বড়ো বড়ো কথা বলছেন?"
লোকটা এক ভ্রু কুঁচকে, ব্যঙ্গাত্মক হাসি নিয়ে বললো, "নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখুন। আপনার সাথে কথা বাড়ানো মানেই বৃথা সময় নষ্ট।"
আমি কিছু বলতে যাবো, তার আগেই তিনি একরকম তাচ্ছিল্যভরে ঘুরে চলে গেলেন। তার হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গিতেও যেন ঔদ্ধত্যের ছাপ ছিল। তার চলে যাওয়ার পর আমি কিছুক্ষণের জন্য সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম, হতোভম্ব হয়ে।
আমার পরিচয় দেওয়া হয়নি। আমার নাম রিমঝিম সেন। পিতা রমেশ সেন, মাতা পদ্মলেখা সেন, আর ভাই রাজদীপ সেন।
সাত সকালে ঝগড়া করে পুরো দিনটাই কোনোরকম ভাবে কাটিয়ে কিছু কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা।
সন্ধ্যা নামতেই মা পদ্মলেখা সেন রীতিমতো চটে উঠলেন। 'মেয়েরা সন্ধ্যা হওয়ার আগে বাড়ি ফিরবে, এটাই নিয়ম,' তিনি প্রায়ই বলেন। আমার দেরি করা নিয়ে তিনি বিরক্ত।
পদ্মলেখা — "বড্ড অবাধ্য হয়েছিস! ভরসন্ধ্যায় একা একা ঘুরে বেড়ানো তোর পছন্দ? রাস্তাঘাট একদম ভালো না, তোর বয়স হয়েছে—"
মা বকতেই লাগলেন।
আমি আর কথা বাড়ালাম না, কোনোমতে মাকে কিছু বুঝিয়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিলাম। কিন্তু মা তাতেও থামলেন না। পেছন থেকে তার কথাগুলো আমার কানে আসছিল, "আর কতদিন এভাবে ঘুরবি? তোর বাবা আর আমি তোকে নিয়ে কত চিন্তা করি। তোর তো এখন সতেরো চলছে, আর ক'টা মাস পর আঠেরোতে পা দিবি। আমাদের সমাজে ১৮ বছর মানেই তো বিয়ের বয়স। কত সম্বন্ধ আসছে, আর তুই কিনা!"
মায়ের কথাগুলো শুনে বুকটা কেমন যেন চাপা হয়ে এলো। বিয়ের কথা ভাবতেই আমার দম বন্ধ লাগছিল। আমি কোনোমতে মাথা নেড়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিলাম।
ফ্রেশ হয়ে পোশাক পরিবর্তন করে রুমে আসতেই দেখি সাঝ সন্ধ্যায় ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি আমার খুব পছন্দের। এটি প্রকৃতির অসাধারণ এক উপহার। শহরের এই কংক্রিটের জঙ্গলে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ তেমন পাওয়া যায় না, কিন্তু আজ যেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই গন্ধটুকুও অনুভূত হচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো টিনের চালে পড়ছে, এক মিষ্টি রিমিঝিমি শব্দ তুলে। সেই শব্দে যেন প্রকৃতির সুর বেজে উঠছে, যা মনকে অদ্ভুত শান্তিতে ভরিয়ে দিচ্ছে। আকাশের মেঘগুলো যেন আরও ঘন হয়ে আসছে। বিদ্যুতের ক্ষণিক ঝলকে পুরো আকাশটা আলোকিত হচ্ছে।
না, এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। ফোনের ফ্লাইট মোড অন করে ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিলাম। নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গেলাম বারান্দার দিকে। মাথার পেছনের অংশটুকু ঠেকিয়ে দিলাম ইটের পিলারে। বৃষ্টির জন্য দৃশ্যটা স্পষ্ট না হলেও দূরে তাকিয়ে রইলাম। বাতাসে গাছগুলো হেলেদুলে ভিজছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলোয় সবুজ পাতাগুলো আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ধীরে ধীরে হাত বাড়ালাম পিলারের পাশ দিয়ে। বৃষ্টির শীতল পরশ হাতের তালুতে পড়তেই এক অন্যরকম শিহরণ অনুভূত হলো। এই সুন্দর ঝোড়ো বাতাস আর বৃষ্টির ছোঁয়া মনটা ভালো করে দিল। ওই লোকটার জন্য দিন খারাপ গেলেও এই বৃষ্টি ভেজা রাতটা যেন এক অন্যরকম সুখ এনে দিলো।
স্বপ্ননীড় 💒💖
______________
এই বাড়িটির নাম "স্বপ্ননীড়", যা রিমঝিমের দেওয়া। এই বাড়িটি নিয়ে প্রত্যেকটা সদস্যের আবেগ জড়িয়ে আছে। দিনের পর দিন ভাড়া বাড়ি থেকে খুব কষ্টে, ধার-দেনা, লোন করে সামান্য জমি কিনে একেবারে ঘর তৈরি করতে পারেননি রমেশ সেন।
কিছু বছর বিরতি নিয়ে প্রতিবছর একটু একটু করে "স্বপ্ননীড়" তৈরি করছেন।
এখনো ভবনটি সম্পূর্ণ হয়নি, আপাতত থাকার মতো করে তারা এখানে চলে এসেছেন। দিন আনা দিন খাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পড়েন রমেশ সেন। এত কষ্টের পর এই বাড়িটা তৈরি হওয়ায় কিছুটা হলেও শান্তি পেয়েছেন তিনি ও তার স্ত্রী।
পরের দিন ভোর, ৪:০০🌅
___________________
প্রতিদিনের মতো ফোন কর্ণভেদী শব্দে বেজে উঠলো। অ্যালার্মের শব্দ।
রিমঝিম উঠে বসে হাত বাড়িয়ে ফোন অ্যালার্মগুলো বন্ধ করলো। ৪-৫টা অ্যালার্ম দেওয়া থাকে, কারণ বিছানা ছেড়ে উঠতে আলসেমি হয়। এই মুহূর্তে কোনো সাউন্ড তার পছন্দ হচ্ছে না।
রিম উঠে ওয়াসরুমে ফ্রেশ হয়ে গেলো। তার মতে বাসি মুখ দেখলে বা কাউকে দেখালে দিন খারাপ যায়। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেলো মর্নিং ওয়াকের জন্য। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস, তপ্তহীন সোনালী রোদ রিমঝিমকে সারাদিনের এনার্জি দেয়। "মন ভালো থাকলে সব ভালো"—মন ভালো করার সেরা উপায় ভোর সকালের মাঝামাঝি সময়টার সৌন্দর্য উপভোগ করা। কয়েকটা বাড়ির পর পাকা সড়কে উঠে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল "কুকুর" আছে কিনা। হ্যাঁ, রিমঝিম কুকুরকে ভীষণ ভয় পায়। অনেক দূরে ২-৩টি কুকুর শুয়ে আছে, সে তার উল্টো দিকে ঘুরে কিছু পথ হেঁটে আস্তে আস্তে দৌঁড়াতে থাকলো।
দৌড়াতে দৌড়াতে এক ফাঁকা জায়গায় হাঁপাতে হাঁপাতে থামলো রিমঝিম। আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো, ঠিক যেন মেঘেদের ক্যানভাস। বুক ভরে জোরে শ্বাস নিলো। আজকে আকাশে মেঘের আঁকিবুকির দৃশ্যটি খুবই মনোরম। রিমঝিমের মন ফুরফুরে হয়ে গেলো। পাশ দিয়ে বেরিয়েছে যাচ্ছে একের পর এক মালবাহী ট্রাক। হাতে গোনা কয়েকটি ফাঁকা ট্রাক ঝংকার তুলে এগিয়ে আসছে। দিনের আলো ফুটছে, বাড়ি ফেরার উদ্দেশে পা বাড়ালো সে। হঠাৎ চোখ পড়লো কিছুটা দূরে একটা ছেলে ব্যায়াম করছে।
ছেলেটির ব্যায়ামের পদ্ধতি দেখে মনে মনে ভাবলো, "বাড়ি ফিরে আমিও এটা চেষ্টা করবো।" হাঁটতে লাগলো বাড়ির দিকে।
হঠাৎই পিছন থেকে একজন চিৎকার করে উঠলো, "এই মেয়ে দাঁড়াও!"
রিমঝিমের মনে হলো তাকেই উদ্দেশ্য করে। সে পেছন ঘুরে তাকালো, সেই ব্যায়াম করা ছেলেটি তার দিকে এগিয়ে আসছে।
স্বাভাবিকের তুলনায় একটু স্বর উঁচু করে রিমঝিম বলে উঠলো, "আমাকে ডাকছেন?"
সে — "হ্যাঁ, দাঁড়াও।"
ছেলেটি খুব ধীরে সুস্থে এগিয়ে আসছে। তার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো দেখা গেলো না। এক দৃষ্টে তাকিয়ে লোকটাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো রিমঝিম।
"উম হুম চেনা চেনা তো লাগছে না," নিচু স্বরে আউড়ালো রিমঝিম।
ছেলেটি আরও একটু কাছে আসতেই রিমঝিমের কাছে মুখটা স্পষ্ট হলো।
"আরে! এ তো কালকের সেই ধাক্কা লাগা ছেলেটা! এ আবার কী বলবে? ধ্যাৎ, ভালো লাগে না।" রিমঝিম মনে মনে বিরক্ত প্রকাশ করলো।
ছেলেটি তার কাছে এসে ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বললো, "আজকে তো আর ধাক্কা লাগেনি, ম্যাডাম?"
রিমঝিম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। এই লোকটা কি তাকে অনুসরণ করছে? তার বিরক্তিটা এবার রাগে পরিণত হলো। "শুনুন, আপনার কী সমস্যা বলুন তো? কালকেও আপনি, আজকেও আপনি! আপনি কি আমাকে অনুসরণ করছেন?"
ছেলেটি এবার হেসে উঠলো। তার হাসিটা বেশ আকর্ষণীয়, কিন্তু রিমঝিমের মেজাজ ভালো নেই।
"অনুসরণ? ম্যাডাম, আপনি নিজেকে কী ভাবেন? আমি এই রাস্তায় রোজ আসি। আপনার মতো রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ি না।"
"রাস্তার মাঝখানে! আমি রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আপনিই আমার দিকে এগিয়ে এসেছেন।" রিমঝিম পাল্টা জবাব দিলো।
ছেলেটি তার দিকে এক পা এগিয়ে এসে বললো, "আমি এখানে দাঁড়িয়ে ব্যায়াম করছিলাম, আর আপনি আমার ব্যায়ামের নকল করার চেষ্টা করছিলেন। আমি কি ভুল বললাম?"
রিমঝিম লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। সে বুঝতে পারছিল না কী বলবে। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল।
ছেলেটি তার এই অবস্থা দেখে মুচকি হেসে বললো, "আপনি খুব কিউট যখন এভাবে রেগে যান।"
রণদীপের মুখ থেকে কথাটা শুনে রিমঝিমের মাথায় যেন কেউ এক বালতি বরফ ঢেলে দিলো। রাগের আগুনে সে টগবগ করে ফুটছিল, আর এই মন্তব্যটা যেন সেই আগুনে ঘি ঢেলে দিল। তার মুখটা মুহূর্তেই লাল হয়ে গেলো, কান পর্যন্ত যেন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে সে অদৃশ্য হয়ে যাক!
"আপনার মতো অভদ্র লোকের সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগছে না,"
এই কথাটুকু কোনোমতে বলেই সে দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করলো। প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল তার ক্ষোভ, অপমান এবং এক নতুন ধরনের কৌতূহল। সে আর পেছনে ফিরে তাকালো না, কিন্তু রণদীপের শেষ কথাগুলো তার কানে বারবার বাজছিল,
"শুনুন, আমার নাম রণদীপ। আবার দেখা হবে!"
রিমঝিম নিজের অজান্তেই মুচকি হাসল। 'আবার দেখা হবে?' সে মনে মনে বলল। তাহলে কি সে সত্যিই চাইছে যে তাদের আবার দেখা হোক? তার মনে কৌতূহল আর মুগ্ধতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ দানা বাঁধছিল। এই লোকটা তাকে বিরক্ত করছে, কিন্তু একই সাথে তার মধ্যে একটা অজানা আকর্ষণ তৈরি করছে। প্রথম দিন ঝগড়া, দ্বিতীয় দিন রাগ... পরের দিন কী হবে, সেটা জানার জন্য তার মনটা উসখুস করছিল।
চলবে?
[, বি. দ্রঃ এই প্রথম কিছু লেখার চেষ্টা করেছি। ভুল ত্রুটি হলে মার্জনা করবেন। ভুল ধরিয়ে দেবেন, উত্তর পেলে নিয়মিত গল্প লিখবো, ধন্যবাদ ]
ছবি- Rim Jhim