16/09/2025
ডেভেলপার নির্বাচনের আগে যা জানা জরুরি
নিজের বাড়ি সবারই স্বপ্ন। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণ করতে গেলে অনেক সময়ই ঝামেলায় পড়তে হয়, বিশেষ করে যখন কোনো ডেভেলপার কোম্পানির কাছ থেকে জমি বা ফ্ল্যাট কেনা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, চুক্তির আগে ডেভেলপাররা অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে সেগুলো পূরণ করে না। নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর না করা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা, কিংবা অতিরিক্ত খরচ চাপিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগগুলো প্রায়ই শোনা যায়।
তবে এসব ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু বিষয় জানা থাকলে আপনি সুরক্ষিত থাকতে পারেন। রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এ এই ব্যাপারে বিস্তারিত বলা আছে।
# # # ডেভেলপার নির্বাচনের আগে যা জানা জরুরি
* **নিবন্ধন যাচাই:** কোনো ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে তাদের সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নিবন্ধন আছে কি না। আইন অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এই নিবন্ধন নবায়ন করতে হয়।
* **অনুমোদিত প্রকল্প:** কোনো ডেভেলপারকে প্রকল্প অনুমোদনের আগে বিজ্ঞাপন বা বিক্রয় চুক্তি করার অনুমতি নেই। তাই প্লট বা ফ্ল্যাট কেনার আগে অবশ্যই প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা এবং জমির মালিকানার কাগজপত্র ভালো করে যাচাই করে নিন। ডেভেলপার এগুলো দেখাতে বাধ্য।
* **প্রকল্পের বিজ্ঞাপন:** ডেভেলপারকে তাদের বিজ্ঞাপনে নিবন্ধন নম্বর, নাম-ঠিকানা, এবং অনুমোদিত নকশার নম্বর ও তারিখ উল্লেখ করতে হবে। কোনো ডেভেলপার যদি নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করে বা অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের কাজ শুরু করে, তাহলে তাদের জেল বা জরিমানা হতে পারে।
# # # ডেভেলপার ও মালিকের মধ্যে চুক্তি
জমি বা ফ্ল্যাট সংক্রান্ত চুক্তি করার সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখা দরকার:
* **সম্পূর্ণ চুক্তি:** চুক্তিতে ডেভেলপার এবং জমির মালিকের অংশের পরিমাণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়াও, নির্মাণ কাজ শুরু এবং শেষ করার সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করতে হবে।
* **সময়মতো হস্তান্তর:** যদি ডেভেলপার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাট বা প্লট হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের কারাদণ্ড বা জরিমানা হতে পারে। একইভাবে, জমির মালিক যদি সময়মতো ডেভেলপারকে জমি বুঝিয়ে না দেয়, তাহলে তিনিও দণ্ডিত হবেন।
* **রক্ষণাবেক্ষণ:** চুক্তি অনুযায়ী, ফ্ল্যাট হস্তান্তরের পর ডেভেলপারকে কমপক্ষে এক বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। যদি নির্মাণের ত্রুটির কারণে মেরামতের প্রয়োজন হয়, তাহলে দুই বছর পর্যন্ত ডেভেলপার নিজ খরচে তা করে দেবে।
* **ইউটিলিটি সার্ভিস:** ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সার্ভিস নিশ্চিত করতে হবে।
# # # ফ্ল্যাট কেনা ও আর্থিক লেনদেন
ফ্ল্যাট কেনার সময় ডেভেলপারের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করা বাধ্যতামূলক। এই চুক্তিতে সব শর্ত, যেমন - ফিটিংস, ফিক্সচার, এবং নির্মাণসামগ্রীর বিস্তারিত বিবরণ থাকবে।
* **মূল্য পরিশোধ:** ফ্ল্যাটের সম্পূর্ণ মূল্য এককালীন বা কিস্তিতে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। আপনি যদি কিস্তি দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে ডেভেলপার আপনাকে ৬০ দিনের নোটিশ দিয়ে বরাদ্দ বাতিল করতে পারে। তবে, আপনি বিলম্বিত কিস্তির জন্য ১০% হারে সুদসহ অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন (সর্বোচ্চ তিনবার)।
* **সময়মতো হস্তান্তর:** যদি ডেভেলপার নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে চুক্তিতে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণসহ সব টাকা ছয় মাসের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। যদি চুক্তিতে কোনো ক্ষতিপূরণের পরিমাণ উল্লেখ না থাকে, তাহলে তা পরিশোধিত অর্থের ওপর ১৫% হারে নির্ধারিত হবে।
* **বরাদ্দ বাতিল:** যদি আপনি কোনো কারণে বরাদ্দ বাতিল করতে চান, তাহলে ডেভেলপার আপনার পরিশোধিত অর্থের ১০% কেটে রেখে বাকি টাকা তিন মাসের মধ্যে ফেরত দেবে।
# # # বিরোধ ও বিচার পদ্ধতি
যদি চুক্তি নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দেয়, যেমন: নোটিশ ছাড়া বরাদ্দ বাতিল, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, বা অননুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ, তাহলে প্রথমে উভয় পক্ষ মিলেমিশে সমাধানের চেষ্টা করবে। যদি তাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সালিস আইন-২০০১ অনুযায়ী সালিসি ট্রাইব্যুনালে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো যেতে পারে। যদি ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হয়, তাহলে যেকোনো পক্ষ উপযুক্ত আদালতে মামলা করতে পারবে।
সবশেষে বলা যায়, নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য ডেভেলপারদের সঙ্গে কাজ করার সময় আপনাকে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। একই সাথে, ডেভেলপার কোম্পানিরও উচিত সময়মতো ও সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করা। উভয় পক্ষের সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণই একটি সুন্দর এবং ঝামেলামুক্ত বাড়ি বা ফ্ল্যাটের স্বপ্নকে বাস্তব করতে পারে।