21/04/2026
খুব জানতে ইচ্ছে করে উপন্যাস এর প্রিয় চরিত্ররা যদি সত্যি হতো তাহলে কেমন হতো তাদের এই জীবন..!
হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ এর অপরিচিতা গল্পের অনুপম আর কল্যানীর কথা মনে পড়লো!
কেমন আছে এখন তারা...?
পাহাড়ি স্টেশনের সেই ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম। ঝাপসা কুয়াশার ভেতর দিয়ে ট্রেনের বাঁশি শোনা যাচ্ছে দূরে। অনুপম স্টেশনের বেঞ্চে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের আনাগোনার দিকে। ঠিক তখনই কানে এল সেই পরিচিত সুর—যে সুর এককালে ট্রেনের কামরায় কান পেতে শুনেছিল সে।
"একটু জায়গা হবে কি?"
অনুপম চমকে মুখ ফেরাল। সামনে দাঁড়িয়ে কল্যাণী। বয়স বেড়েছে, চোখেমুখে এখন দৃঢ়তার ছাপ, কিন্তু সেই অমলিন স্নিগ্ধতা এতটুকু কমেনি। অনুপম স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বহু বছর পর দুজনেই মুখোমুখি।
অনুপম অস্ফুট স্বরে বলল, "তুমি... এখানে?"
কল্যাণী হালকা হাসল। সেই হাসিতে কোনো সংকোচ নেই, নেই কোনো পুরনো অভিমান। সে শান্তভাবে বসল বেঞ্চের একপাশে। বলল, "মেয়েদের স্কুলের কাজে এই পাহাড়ি গ্রামে আসতে হয় মাঝে মাঝে। আপনিও কি এদিকে?"
অনুপম কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি তো সেই পনেরো বছর আগেই ঘর ছেড়েছি কল্যাণী। এখন আমার কোনো গন্তব্য নেই, শুধু তোমার ওই 'জায়গা আছে' কথাটাকে সম্বল করে পথ চলাই আমার জীবন।"
কল্যাণী পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, "পৃথিবীর সব জায়গাই কি আর সমান হয়? কিছু জায়গা থাকে হৃদয়ে, আর কিছু থাকে কর্তব্যে। আমি নিজের পথ খুঁজে নিয়েছি অনুপম বাবু। সেই ভাঙা বিয়ের লগ্ন থেকে যে পথ শুরু হয়েছিল, তা আজ অনেক বিস্তৃত।"
অনুপম অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বলল, "আমি জানি, আমি সেদিন বীরত্ব দেখাতে পারিনি। সেদিন এর সেই দুর্বল ছেলেটাকে ক্ষমা করা কি খুব কঠিন ছিল?"
কল্যাণী এবার তার চোখের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে এক গভীর মমতা ফুটে উঠল। সে বলল, "ক্ষমার কথা কেন? সেদিনের সেই ঘটনার জন্যই সমাজ আর প্রথার শেকল ভেঙে আজ আমি শত শত মেয়ের মাঝে নিজের মুক্তি খুঁজে পাই। আপনি তো আমার সেই মুক্তির প্রথম সোপান ছিলেন।"
অনুপম একটু ম্লান হেসে বলল, "আমি কেবল দূর থেকে দেখার অধিকারটুকুই চেয়েছিলাম। আজও তাই চাই।"
ট্রেন আসার সংকেত বাজল। কল্যাণী উঠে দাঁড়িয়ে তার ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিল। চলে যাওয়ার আগে সে একবার থামল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, "বিকেলের এই রোদে পাহাড়ের ছায়া যখন দীর্ঘ হয়, তখন একা একা হাঁটবেন না। পাহাড়ের নির্জনতা মাঝে মাঝে মানুষকে বড় বেশি একা করে দেয়।"
অনুপম দেখল কল্যাণী ভিড়ের মধ্যে মিশে যাচ্ছে। তার মনে হলো, কল্যাণী আজও সেই ট্রেনের সেই রহস্যময়ী মেয়েটিই রয়ে গেল, যাকে চেনা যায় কিন্তু ছোঁয়া যায় না। তার গন্তব্য নির্দিষ্ট, আর অনুপম আজও সেই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা এক চিরস্থায়ী যাত্রী।
কুয়াশা মাখা পাহাড়ি পথে কল্যাণী মিলিয়ে গেল, আর অনুপমের মনে হলো, কল্যানী এক মুক্ত আত্মা,জীবনের বন্ধন যার কাছে তুচ্ছ!!
#গল্প -১(হারিয়ে যাওয়া প্রিয় চরিত্র)
#উপন্যাস
#প্রিয়_চরিত্র
#রবীন্দ্রনাথ
#অনুপম_কল্যানী
#অপরিচিতা