25/11/2025
আমি মরে গেলে বা ডিভোর্স হলেও আমার হাজবেন্ড আবার বিয়ে করবে কিনা, সেটি নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। মানুষ তো মানুষই। পলিগ্যামিকে অস্বীকার করা যায় না। অতএব তার জীবনে কে আসবে, কে যাবে, সে হিসেব আমার নয়।
আমি বরং ভাবি, আমার আলমারির প্রথম তাকে যত্নে গুছিয়ে রাখা ব্যবহার না করা বালিশের কাভারগুলো একদিন নিশ্চয়ই সে ব্যবহার করে ফেলবে। যে শাড়িটা আমি এখনো পরিনি, ভেবেছিলাম একদিন তার সামনে পরব সেটাও হয়তো একদিন তার হয়ে যাবে।
আমার মাটির ছোট্ট নকশা করা ব্যাংকটা, নয়নতারা ফুলের গাছ, নতুন হাঁড়িপাতিল সবই একদিন তার দখলে যাবে। হয়তো সেই হাঁড়িতেই একদিন সে খিচুড়ি রেঁধে ফেলবে। আমার ড্রেসিং টেবিলে তখন অন্য কারও প্রসাধনসামগ্রী সাজানো থাকবে।
আয়নাটিও যেন নতুন মুখ চিনে নেবে, আমার প্রতিচ্ছবি মুছে গিয়ে সেখানে অন্য এক নারীর মুখ ভেসে উঠবে প্রতিদিন।
আমার হাতে লেখা রেসিপির খাতা, বুকশেলফে রাখা প্রিয় বইগুলো, চায়ের কাপের দাগ লেগে থাকা আমার মগ, বিছানার পাশে রাখা পুরোনো চশমা সবই একসময় হয়তো তার গুছিয়ে রাখার জিনিস হয়ে যাবে।
বারান্দায় আমার উপস্থিতি থাকবে না, তবুও আমার স্মৃতি নিঃশব্দে কোথাও না কোথাও ভেসে বেড়াবে।
আমার এত যত্নে, তিলে তিলে সাজানো এই ছোট্ট সংসারটার পর্দা, বালিশ, ফুলদানি একদিন অন্য কারও হয়ে যাবে। এই ভাবনাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। কারণ এই ঘর আমি শুধু টাকায় নয়, হৃদয়ের পরম স্নেহে গড়ে তুলেছি। এই সংসারের প্রতিটি জিনিসে আমার নিঃশব্দ ভালোবাসা মিশে আছে।
মানুষটা যে কখনও মনে মনে অন্য কারও হয়ে গেলেও বিশ্বের কেউ তা জানতে পারবে না। তাই মানুষটাকে নিয়ে আমার ভাবনা কম। আমি বরং আমার সংসারটাকেই বেশি ভালবাসি। আমার জড়িয়ে থাকা বিছানার চাদর, আমার ছোঁয়া থাকা দেয়াল, আমার পছন্দের পর্দা,আরো কতকি!
কাপড় কেনার চেয়ে বাসনপত্র কিনতে আমার ভালো লাগে, সাজগোজের চেয়ে ঘর সাজাতে ভালোবাসি। আমার মা ছোটবেলা থেকেই এটা বুঝতেন। তাই বিয়ের পরও তিনি আমার ঘরটাকে আগের মতোই রেখে দিয়েছেন। কাউকে কিছু ব্যবহার করতে দেন না। ভাইদের বলে রেখেছেন,
“আমার মেয়ের রুম যেমন আছে তেমনই থাকবে আজীবন। তোমরা তোমাদের সংসার মনমতো সাজায়ো, কিন্তু আমার মেয়ের ঘর কেউ দখল করবে না। আমার মৃত্যুর পরও না।”
আমার মা বুঝে গেছেন আমি আসলে তিলে তিলে ঘর বাঁধা মানুষ। নিজের হাতে রঙ লাগানো একেকটা জিনিসের সাথে আমার আত্মার সুতো জড়িয়ে আছে।
তাই চাই না আমার গড়া ঘর অন্য কারও নামে চলে যাক। সকলের ঘর আরও সুন্দর হোক, আরও সুখের হোক কিন্তু আমার এই ছোট্ট সংসার, এই আলমারি, এই বিছানা, এই ফুলদানিগুলো, ওই টেবিল ল্যাম্পটা, ক্যান্ডেলগুলো শুধু আমারই থাকুক।
তেমনি, কোনো কারণবশত আমার হাজবেন্ড বা আমি আলাদা হয়ে গেলেও আমি মনে করি ব্যক্তিগতভাবে তেমন ক্ষতি অনুভব করব না। ইমোশনালি ত যেকোনো সম্পর্ক থেকে বের হওয়াটাই কষ্টের । সেটা ভিন্ন আলাপ। মানুষ বদলায়, সম্পর্ক বদলায় এটাই স্বাভাবিক। আমরা সবাই বদলাতে পারি।
কিন্তু আমার এই সংসারটার কী হবে এই ভাবনাটাই আমাকে ভেতর থেকে আলোড়িত করে।
একা হয়ে যাওয়ার ভয় নেই,ভয় আছে আমার গড়া ঘরটা অন্য কারও হয়ে যাওয়ার।
মনে হয় যেনো, “নারীরা সংসার বোনে সূক্ষ্ম সুতোয়, পুরুষেরা দেখে শুধু দেয়ালের রং।”
সবারই কি এমন অনুভূতি হয়? নাকি আমি একাই এমনভাবে ভাবা মানুষ? 🌿
বিঃদ্রঃ ভরদুপুরে অবসর মনের ভাবনা। হাজবেন্ডের সাথে ঝগড়ারও হয়নি, আপাতত ছাড়াছাড়িও হয়ে যাচ্ছে না। সুতরাং আকাশ কুসুম না ভাবার অনুরোধ৷ এটি কেবলই একটি লেখা।