21/05/2026
ফ্ল্যাটের সামনে আপনার মেয়ের একটি জুতো পড়ে আছে। অপরটি নেই। আপনার কলিজায় কামড় দিলো অশুভ এক চিন্তায়। আপনি পাগলের মতো ছুটোছুটি করতে লাগলেন। বিল্ডিংয়ের প্রতিটি ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন মেয়ের খোঁজে।
সব ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও, আপনার ফ্লোরের পাশের ফ্ল্যাটটির দরজা বন্ধ। কেউ খুলছে না। ততক্ষণে সবাই জড়ো হয়ে গিয়েছে। ৯৯৯ নাম্বারে ফোন দেওয়া হলো। পুলিশ এসে দরজা ভেঙ্গে ফেললো।
আপনার মেয়ের নিথর দেহ পড়ে আছে সেই ফ্ল্যাটের নোংরা একটি ঘরে। মেঝে লালিমায় ভেসে গিয়েছে।
আর বাথরুমের বালতি থেকে পাওয়া গেলো আপনার সেই প্রিয় মুখটি, যে মুখটিতে জন্মের পর থেকে আজ অবধি এঁকেছিলেন অজস্র চুমু। চুলে ময়লা হলে যে চুলে যত্ন নিতেন, তেল দিতেন, শখ করে ঝুঁটি কিংবা বেণী করে দিতেন। সে চুল খামচে ধরেই খুনি এখানে এনে রেখে দিয়েছে।
মেয়েকে শিক্ষিত করে মাথা উঁচু করে বাঁচার যে স্বপ্ন দেখতেন। সেই মাথা ঠিকই আছে। শুধু দেহের সাথে আর নেই।
আপনি মা। আপনি বাবা। এই নৃশংস দৃশ্য সহ্য করবেন কীভাবে?
দরজা ভাঙ্গার পর লাশের পাশ থেকে ঘাতক সোহেল রানার স্ত্রীকে আটক করে পুলিশ। কিন্তু ঘাতক তিনতলার জানালার গ্রীল কেটে পালিয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। পরবর্তীতে তাকে নারায়নগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
শিশু লামিসা। বয়স ৭-৮ বছর বয়স। আজ সকালে মিরপুরের এই ঘটনায় আবারও নারকীয় বর্বরতার সাক্ষী হলো বাংলাদেশ।
পুলিশ মনে করছে লামিসার প্রতি বিকৃত আকর্ষণ থেকে এই নৃশংসতা চালিয়েছে সোহেল। সোহেলের স্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর স্বামী একজন বিকৃত যৌনাচার ব্যক্তি। সোহেল তাকেও নির্যাতন চালাতো সে। পুলিশ জানিয়েছে, ধ**** ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়া যাবে ময়নাতদন্তের পর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না কেন লামিসাকে বাঁচালো না?
শিশুর প্রতি - বিশেষ করে মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতায় বাংলাদেশ হয়তো বিশ্বরেকর্ড করে, কুখ্যাত হওয়ার লড়াইয়ে প্রথম হওয়ার চেষ্টায়। নইলে একেরপর এক বর্বর ঘটনা কেন আমাদেরকে দেখতে হবে?
আমাদের মেয়েদেরকে যদি নিরাপত্তা দিতে না পারেন। সুষ্ঠু বিচার যদি করতে না পারেন। তাহলে আমাদের বলেন, আমরা এই দেশে মেয়ে জন্ম দেওয়া বন্ধ করে ফেলি। যারা জন্মেছে তাদেরকেও নিজ হাতে _______।
(২) সেদিন একটি ভিডিও দেখে বেশ আঁতকে উঠেছিলাম। ৫টি ছোট্ট ছেলে। ৯-১০ বয়স হবে। গলির মোড়ে। একজন সিগারেট ধরিয়েছে। বাকী ৪ জন পাহারা দিচ্ছে। ততক্ষণ পর্যন্ত অনেকের কাছে হাস্যরসের মতো লাগলেও হঠাৎ সিগারেট খাওয়া ছেলেটি নিজের প্যান্টের চেইন খুলে ফেললো। মাটিতে শুয়ে পড়লো। অন্ধকার এই গলিতে ছেলেটির নিচে আরেকজনের ছোট্ট দুটো পা দেখা যাচ্ছে। এত ভয়ঙ্কর একটি দৃশ্য!
এই যে মেয়ে শিশুটি। সে বাইরে কী করছে? ওর মা-বাবা কোথায়? ওনারা নিশ্চয়ই মেয়েকে এই হালেই ছেড়ে দিয়েছে। আবার হয়তো জানেও না যে, তাদের মেয়েটি কোন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছে। কাদের সাথে খেলছে বা মিশছে। সেই খেয়ালটুকু রাখার প্রয়োজনীয়তাবোধটুকু নেই।
এই বয়সের শিশুরা এমন আচরণ কোথা থেকে শিখছে? তারা কীভাবে এমন কিছু অনুকরণ করছে, যার গভীরতা বা পরিণতি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই থাকার কথা নয়?
এই শিশুগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
এরাই হয়তো পরিণত বয়সের আগেই ভয়ঙ্কর কোন ঘটনার ভিক্টিম বা ক্রিমিনাল হয়ে যাবে। তখন বাবা মায়ের নিজের কপালে থাপ্পড় মারা ছাড়া উপায় থাকবে না। যা সর্বনাশ ঘটার ঘটে গিয়েছে।
(৩)
বাবা মায়েদেরকে বুঝতে হবে সন্তান কোন রাস্তার প্রাণী নয়। যে জন্ম দিলাম আর এর দুয়ারে, ওর দুয়ারে ঘুরে ঘুরে নিজে নিজেই বড় হয়ে যাবে।
সন্তান হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া আপনার জীবনের পাওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ দান। সেই যুগ আর নেই যে হেলতে দুলতে সন্তান বড় করে ফেলবেন।
সপ্তাহ খানেক আগের ঘটনা। ফুটফুটে শিশু ফাহিমা। প্রতিবেশী চাচা তাকে সিগারেট আনতে পাঠায়। সিগারেট আনার পর শিশুটিকে ঘরে একা পেয়ে ধ__ন চেষ্টা করতে গেলে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে যায়। তখন ভয় পেয়ে তাকে গলা টিপে হত্যা করে। এরপর ব্রিফকেসের ভেতরে দুদিন খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। গন্ধ বের হলে রাতের আঁধারে খালে ফেলতে গিয়ে ধরা খেয়ে যায়।
ফাহিমার বাবা মায়ের নিশ্চয়ই আফসোস হয়। বলে, 'আল্লাহ তুমি যদি একবার মেয়েটিকে ফেরত দিতে। তাহলে চোখে চোখে রাখতাম। চোখের আড়াল হতে দিতাম না।' কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তার হাল এমন হয়েছে - যেখানে আপনার সন্তানকে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে মেয়ে সন্তান। আপনার সন্তান কার সাথে মিশছে। কার সাথে খেলছে। কোন কনটেন্ট দেখছে। আপনাকে প্রতিটি বিষয়েই নজর রাখতে হবে।
মেয়েকে ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে নিশ্চিন্তে খেলাধুলা করতে দিবেন? কোন রকমের নজরদারী ছাড়াই? ভাবছেন! ওরা তো শিশু। সেই সুযোগও আর নেই।
আপনি এমন এক দেশে বাস করছেন যেখানে না পরিবার-স্বজন, বয়সে মাইনর কিংবা বৃদ্ধ, বাড়িওয়ালা, কাজের বুয়া, দারোয়ান, স্কুল শিক্ষক, মাদ্রাসা শিক্ষক, প্রতিবেশী, দোকানদার এমন কোন প্রাণী নাই যার কাছে আপনার সন্তান নিরাপদ।
কিডন্যাপিং, শত্রুতা, লালসার বলি হচ্ছে আমাদের নিষ্পাপ সন্তানেরা।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে: এত বড় বড় নৃশংস ধর্ষণ কিংবা হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরেও রাষ্ট্র এসবের বিচার করতে না পারা। বিচার যদি না হয়! মানুষ অপরাধ করতে ভয় পাবে কেন?
রাষ্ট্র চায় আমরা ভয়ে ভয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকি। যত ভয়। যত সমস্যা। তত রাজনীতি করার সুযোগ। সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে ভোটের রাজনীতি করবে কাদের সাথে? নইলে অপরাধীদেরকে বাঁচিয়ে রাখে কেন? কোন স্বার্থে?
তাই ভয় নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকার আর সতর্কতা ছাড়া বিকল্প কোন অপশন নেই আপনার হাতে।
সন্তানের নিরাপত্তার জন্যই আশেপাশের প্রত্যেককেই সন্দেহজনক ও অনিরাপদ ভাবতে হবে। সবসময় সতর্ক থাকতেই হবে।
আপনার ছেলে মেয়েকে সেফটি স্কিল (গুড টাচ/ব্যাড টাচ) শেখাতে হবে। মোমের পুতুল না বানিয়ে বানাতে হবে যোদ্ধা। ভয়ে অনেক শিশুই মুখ খুলে না। বছরের পর বছর মুখ বুঝে সহ্য করে। আপনাকে সেই ভয় দূর করতে হবে।
দুনিয়ার যত ভয়ঙ্কর কিছুই ঘটুক না কেন! আপনার সন্তান যাতে আপনাকে সব বলে দেয়। সেই বিশ্বস্ততা, সেই বন্ধুত্ব গড়তে হবে। ঐ হাত শক্ত করে ধরতে হবে। যতদিন না ওরা নিজেরাই নিজেদের খেয়াল রাখতে পারবে।
যে রাষ্ট্র! আপনার সন্তানকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। অপরাধীদেরকে বিচার করতে ব্যর্থ। সেই রাষ্ট্রে যদি এখনও যে আপনার সন্তান নিরাপদ। আপনি শুকরিয়া আদায় করুন। কিন্তু কতক্ষণ নিরাপদ থাকবেন। সেই গ্যারান্টি নেই।
আপনি ধরে নেন, আপনার ঘরে থাকা সন্তানটিই ফাহিমা কিংবা লামিসা। ওরা এখনও নিরাপদ রয়েছে। তাদেরকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রাখুন। শপথ করুন, চোখের আড়াল হতে দিবেন না। অসতর্ক হবেন না।
লামিসার মতো ফুটফুটে মিষ্টি একটা মেয়ে আজকে প্রাণ হারালো। লাশের সারি বাড়তেই আছে। এমন হাজার হাজার লাশ আমরা পেরিয়ে এসেছি। তবুও থামাতে পারিনি এই লাশের মিছিল।
মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতায় বাংলাদেশ হয়তো কুখ্যাত হওয়ার লড়াইতে প্রথম হওয়ার চেষ্টায়। নইলে একেরপর এক বর্বর ঘটনা কেন আমাদেরকে দেখতে হবে?
আমাদের মেয়েদেরকে যদি নিরাপত্তা দিতে না পারেন। সুষ্ঠু বিচার যদি করতে না পারেন। তাহলে আমাদের বলেন, আমরা এই দেশে মেয়ে জন্ম দেওয়া বন্ধ করে ফেলি। যারা জন্মেছে তাদেরকেও নিজ হাতে _______।
- অন্তর মাশঊদ