29/04/2026
কিছুদিন আগে খুব যত্ন করে বেশ বড়সড় একটা ফ্ল্যাট এর প্ল্যান করলাম। স্কয়ার ফুট হিসেবে হিসাব করলে কাজের ফি একেবারেই সামান্য।
কিন্তু ক্লায়েন্ট বললেন, “অন্যরা তো এর চেয়ে অনেক কমে করে দিচ্ছে... কেউ কেউ তো ফ্রিতেও করে।”
কথাটা শুনে আমার কেমন যেন খটকা লাগল। মনে হলো, তাই তো! আমি কি আসলেই বেশি চেয়ে ফেলেছি? বাঙালির তো আবার এই এক সমস্যা, কেউ একটু কড়া কথা বললেই নিজের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায়।
কিন্তু রাতে যখন একা বসে হিসাবটা মেলাতে গেলাম, তখন একটা অদ্ভুত সত্য আবিষ্কার করে আমার নিজেরই অস্বস্তি হতে লাগল। সমস্যাটা আসলে আমার পারিশ্রমিক বেশি হওয়া নিয়ে নয়। সমস্যাটা হলো, আমরা বড় সহজেই নিজেদের কাজের দাম কমিয়ে ফেলি।
আমরা আসলে কিসের দাম চাইছি? কয়েক টুকরো কাগজের উপর পেন্সিলের কিছু হিজিবিজি দাগের জন্য? মোটেও না।
আমরা দাম চাইছি এমন কিছু সিদ্ধান্তের জন্য, যা একটা পরিবারের প্রতিদিনের জীবনকে ছুঁয়ে থাকবে। সকালের মিষ্টি রোদটা কোন জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকবে, বিকেলের বাতাস কীভাবে খেলবে, শোবার ঘরের প্রাইভেসি কতটুকু থাকবে, এমনকি মানুষজন ঘরের ভেতর কীভাবে চলাফেরা করবে—এসব তো ওই দাগগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। আর ইট-বালু-সিমেন্ট দিয়ে একবার বাড়ি দাঁড়িয়ে গেলে, এই সিদ্ধান্তগুলো বদলানো যে কত বড় খরচের ধাক্কা, সেটা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বোঝে না।
হ্যাঁ, অনেকেই হয়তো ফ্রিতে বা খুব সস্তায় প্ল্যান করে দিচ্ছে। তাদের হয়তো লোকবল বেশি, কাজ হয় যন্ত্রের মতো। তাদের ব্যবসার হিসাব আলাদা। কিন্তু একজন স্বাধীন আর্কিটেক্ট যখন নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা 'চিন্তাভাবনা' আর স্রেফ 'আঁকাআঁকি'র পার্থক্যটা গুলিয়ে ফেলে, তখন সে নিজেই নিজের সর্বনাশটা করে। ক্লায়েন্টও তখন তাকে আর্কিটেক্ট না ভেবে ড্রাফটসম্যান ভাবতে শুরু করে।
ভদ্রলোকের ওই কথায় আমি আমার পারিশ্রমিক এক পয়সাও কমাইনি। তবে তিনি আমাকে একটা বড়সড় ভাবনার খোরাক দিয়েছেন।
ভালো ডিজাইন করা মানেই শুধু সুন্দর একটা বাড়ি বানানো নয়, নিজের কাজের মূল্যটা অন্যকে ঠিকঠাক বোঝাতে পারাও একটা বড় শিল্প। এই শিল্পটা বোধহয় আমাকে নতুন করে শিখতে হবে।