02/07/2026
আসুন আজকে আমরা একঘন্টা ম্যারেজ কাউন্সেলিং করি ।
লিখেছেন,
ডাঃ শামছুল আলম (শাহীন)
সি ও মে ক /১৯৯৬-৯৭
Specialist in Family Medicine
Melbourne, Australia
আমি প্রাকটিস করি মেলবোর্ন শহরে । দাম্পত্য ইস্যু নিয়ে প্রায়ই রোগীর সাথে কথা বলতে হয় । পৃথিবী বিখ্যাত গটম্যান ইনস্টিউট এর মত এখানেও দুই একটা বড় অর্গানাইজেশন আছে যারা দাম্পত্য জীবন নিয়ে কাজ করেন ।
আমি কাপলদের ওখানে রেফার করি এবং ফলো আপ করি ।
এই বিষয়ে গটম্যান সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ।
আপনি যদি কোন কাপলকে গটম্যানে ম্যারেজ কাউন্সেলিং করতে পাঠান তবে প্রথমেই ওরা কাউন্সেলিং শুরু করবেনা বরং সবার আগে
হাজবেন্ড -ওয়াইফ দুই জন কে এক ঘণ্টার জন্য একটা রুমে আলাদা করে বসিয়ে একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বলে । এই এক ঘন্টা কাউন্সিলর পাশের রুম থেকে ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের কে দেখেন এবং তাদের কথা শুনেন ।
তারপর এই কাপলকে ওনারা বলে দিতে পারেন যে তারা কাউন্সেলিং করে সংসার টিকাতে পারবেন , নাকি পারবেন না । অথবা তাদের একসাথে থাকা উচিত হবে কিনা ।
এই এক ঘন্টার অবজারভেশন শেষে গটম্যান যাদেরকে বলেছেন যে , তাদের আগামী এক বছরে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা ৭০ % , তাদেরকে ফলোআপ করে দেখা গেছে তাদের ৯৭% সম্পর্ক আলাদা হয়ে গিয়েছে ।
আর যাদের রিস্ক ৯০% এর উপরে বলা হয়েছে তাদের সবাই এক বছরের মধ্যেই আলাদা হয়ে গিয়েছেন ।
কথা হলো এই এক ঘন্টা আমাদের জীবনে এক দিনে তৈরি হয়নি ।
ধীরে ধীরে সম্পর্কটা এই ঘন্টায় এসে দাঁড়ায় । তখন আমরা বলি , “অনেক দেরি হয়ে গেছে ।”
আমরা যখন একটা সেলিব্রেটি কাপলকে আলাদা হয়ে যেতে দেখি তখন আমরা খুব অবাক হই । আমরা চিন্তা করি দুইটা মানুষের অর্থ- সম্পদ, সুনাম , উচ্চ শিক্ষা ও জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তারা কেমন করে আলাদা হয়ে যায় ।
তার মানে হলো, আমরা মনে করছি ভালো সম্পর্কের জন্য এই তিনটে জিনিস আমাদের
বেশি প্রয়োজন । কিন্তু হাজারো মানুষের সাথে কথা বলে, এবং তাদের জীবন যাত্রা নিয়ে গবেষণা করে দেখা গিয়েছে ভালো সম্পর্কের সিক্রেট অন্য কিছু । অর্থ সম্পদ , শিক্ষা ও সুনাম নয় ।
এই পৃথিবীতে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে যে গবেষণা গুলি হয়েছে তার প্রায় বেশিরভাগ ছিল মানুষের প্রেম ভালোবাসা ও সুখ নিয়ে Iগ্র্যান্ট ও হার্ভার্ড স্টাডি ছিল ৭৫ বছর দীর্ঘ গবেষণা I গটম্যান স্টাডি প্রায় ৪০ বছর Iএইসব গবেষণা আর্টিকেল গুলি পড়লে সত্যিই অবাক হতে হয় I যেমন গটম্যান স্টাডি অনুযায়ী, এই পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ দম্পতি জীবনে কখনোই তাদের সম্পর্ককে গভীর করার জন্য দ্বিতীয় পক্ষের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ গ্রহণ করেননি I তারা জীবনে সফলতা , চাকরি , সম্পদ অর্জন , বাড়ি -গাড়ি ও সন্তানদেরকে নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করেছেন কিন্তু কখনোই খুব সিরিয়াসলি নিজেদের সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে, নিজের সঙ্গীর সাথে ভালোভাবে সময় নিয়ে আলোচনা ও পরামর্শ করেননি I এর কারন হিসাবে গবেষকরা বলেছেন, মানুষ খুব সহজে নিজেকে পরিবর্তন করতে চায় না I এবং নিজেদের সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন আনা সম্ভব এটাও ভালোভাবে বিশ্বাস করেনা I মাত্র ৩০ শতাংশ দম্পতি এই চেষ্টা করেন I তারা সবসময় নিজেদের সম্পর্কের ব্যাপারে সচেতন থাকেন I এবং সব সময় একটা ভালো কিছু করার চেষ্টা করেন I নিজেদের সম্পর্কটিকে আরো রোমান্টিক ও সুন্দর করার জন্য সার্বক্ষণিক একটা চিন্তা ও চেতনাকে সজাগ রাখেন I আলোচনা ও পরামর্শ করেন এবং প্রয়োজেনে কাজ কর্ম ও নিজেদের চরিত্রে পরিবর্তন নিয়ে আসেন I
এই ৩০ শতাংশ দম্পতিকে অনেক সুখী দেখা গিয়েছে এবং তারা দাম্পত্য জীবনকে দারুণভাবে উপভোগ করেন I
আজকের এই লেখায় গটম্যান ইনিস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী একটা সাধারণ দম্পতি ও বাকি ৩০ শতাংশ সুখী ও রোমান্টিক দম্পতির কথা -বার্তা ও ব্যবহার- চরিত্রে কি পার্থক্য দেখা গেছে তাই নিয়ে লিখবো I
মনে করুন কার্ল ও এলি একটা দারুন সুখী ও রোমান্টিক দম্পতি I তাদের দুজনের মধ্যে আছে গভীর প্রেম , মায়া ও ভালোবাসা I ৬০ বছরের দাম্পত্য জীবন তারা পুরোটাই দারুন উপভোগ করেছেন I একে অপরকে গভীর ভাবে ভালোবেসেছেন I
প্রশ্ন হলো, একটা সাধারণ দম্পতির সাথে কার্ল ও এলির পার্থক্য কোথায় ?
তাদের এই সুন্দর দাম্পত্য জীবনের সিক্রেট কি ?
গটম্যান স্টাডি ও গবেষণায় তিনটা সিক্রেট জানা গিয়েছে I
এই তিনটা সিক্রেট একটু সহজ করে কিছু উদাহরণ সহ লিখছি I
প্রথম সিক্রেট : "এডমাইরেশন"
কার্ল ও এলি সব সময় একে অপরের প্রশংসা করে এবং ধন্যবাদ দেয় I যেমন আমরা প্রায়ই নিজের সঙ্গীকে এই জাতীয় কমেন্ট করি,
- ভাত বেশি সিদ্ধ হয়ে গেছে , কি রান্না করছো ? -তরকারিতে এতো লবন কেন ? মুখে দেয়া যায় ? লবন কি মাগনা ?
-এইটা কি শাড়ি পড়ছো ? এই শাড়ি পরে বাইরে যাওয়া যাবে ?
-অফিস থেকে এতো দেরি করে ফিরলে কেন ?
-বাচ্চাটাকে একটু দেখে রাখতে পারোনা ?
-রোদে পুড়েতো একেবারে কালো হয়ে গেছো I -হাঁটার স্টাইল চেঞ্জ করো I
ইত্যাদি.. ইত্যাদি ...
গবেষণায় দেখা গেছে কার্ল ও এলির মত দম্পতিরা কখনো নিজের সঙ্গীকে এই জাতীয় নেগেটিভ কমেন্ট করে না I
বরং তারা বলে,
-শাড়িতে তোমাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে I
-রান্না দারুন , অনেক মজা করে খেলাম I ধন্যবাদ I
-তোমাকে অফিসে অনেক কাজ করতে হয় , তোমার জন্য সত্যিই মায়া হয় , তুমি অনেক পরিশ্রম করতে পারো I
-তোমার খাওয়া -দাওয়ায় অনেক ব্যালেন্স আছে , ভেরি গুড I
-আমি তোমার ভিতরের রং টাকেই বেশি উপভোগ করি I
যদি কোন কারণে এলি , কার্লের ব্যবহারে বিরক্ত হয়, তাহলে সে সহজ ও সুন্দর করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে I
কি কারণে বিরক্ত সেটি বলে এবং কি করলে তার মন খারাপ দূর হবে সেটিও শেয়ার করে I আবার কার্ল সেই কারন জানার পর দুঃখ প্রকাশ করে I এবং আর কখনো এমন হবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে I
দ্বিতীয় সিক্রেট : "লাভ ম্যাপিং"
এই পৃথিবীতে একটা সময় ইবনে বতুতা কিংবা মার্কো পোলোর মত কিছু মানুষ ছিল যাদেরকে পর্যটক বলা হয় I নতুন দেশকে নতুন জাতিকে জানার জন্য তারা সব সময় হাতে মানচিত্র নিয়ে ঘুরতো I
তাদের স্বপ্ন ও ইচ্ছে ছিল এই পৃথিবীটাকে দেখা ও জানা I এবং নিজের দেখা মানচিত্রের পরিধি বাড়ানো I
এক দেশ থেকে আরেক দেশ I প্রতিদিন নতুন করে একটা জায়গা খুঁজে বের করা I আর সেই গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করা I
একটা দম্পতির প্রথম এক-দুই বছর খুব গভীর প্রেমের সম্পর্ক থাকে এর কারন এই লাভ ম্যাপিং I
একজন আরেকজনকে জানার চেষ্টা করে , একে অপরকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করে I
তারপর একটা সময় তারা মনে করে সব জানা হয়ে গেছে এবং জানার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে I
এই ধারণাটা মনে আসার পর থেকেই নিজেদের প্রেমটা কমে যেতে থাকে , নতুন করে রাজ্য জয়ের উৎসাহটা হারিয়ে ফেলে I
একটা সাধারণ দম্পতির নিত্য দিনের প্রশ্ন ও কথা হলো এমন,
-ছেলে কি হোম ওয়ার্ক শেষ করেছে ?
-বাসায় কি তেল লাগবে?
-আজ রোগীর বুকিং কেমন ছিলো?
-গত মাসের গ্যাস বিল দেয়া হয়েছে ?
-অফিস থেকে আসার পথে একটু সবজির দোকানে যেতে পারবা?
..ইত্যাদি
কিন্তু এলি ও কার্ল একই রকম ঘর সংসার করলেও তারা প্রায় প্রতিদিনই একটা দুইটা ভিন্ন প্রশ্ন করে Iতারা কিছু জিনিস জানতে চায় I
যেমন তারা বলে,
- এলি , মা হওয়ার পর তোমার কেমন লাগছে ?
-তোমার কি দূরে কোথায়ও বেড়াতে যেতে মন চায় ?
-এই বছর তোমার সবচেয়ে বেশি কি করতে ইচ্ছে করছে ?
-আজকে শুধু আমরা দুজন কোথায়ও ডিনার করবো ?
- তোমার কি কোন কারণে মন খারাপ ?ইত্যাদি..
এলি ও কার্ল ষাট বছর একসাথে থাকলেও তাদের জীবনে এই জাতীয় প্রশ্ন কখনই শেষ হয়না I
এই ভাবেই তারা একে অপরকে জানার আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকে I এমনকি শেষ বয়সে মৃত্যুর সময় , একজন আরেকজনের হাত ধরে বসে থাকে I এবং জিজ্ঞেস করে,
-তোমার কি কোন কষ্ট হচ্ছে ?
-বিশেষ কাউকে দেখতে ইচ্ছে করছে ?
নিজের সঙ্গীকে প্রতিদিন জানতে চাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক গভীর মায়া I দুজন মানুষের মধ্যে যত বেশি এই লাভ ম্যাপিং প্রক্রিয়াটা চলতে থাকে ততই তাদের সম্পর্ক গভীর হতে থাকে I এটি হলো দ্বিতীয় সিক্রেট I
তৃতীয় সিক্রেট কে বলা হয়, "টার্নিং টুওয়ার্ডস"
মনে করুন একটা সাধারণ দম্পতির স্ত্রী একটা সুন্দর টিয়া পাখি দেখে তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললো,
-এই দেখোনা কি সুন্দর টিয়া পাখি !
কিছু স্বামী শুধু বলবে,
-হুম .....
আর কিছু বলবে না এবং ফিরেও তাকাবেনা I
কেউ হয়তো এমনও বলতে পারে,
-পাখি দেখার সময় আছে ?
ভদ্রলোক হয়তো পাখির দিকে না তাকিয়ে ড্রাইভার কে বলবে
-আরে, তাড়াতাড়ি যাওতো I
কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে কার্ল বলবে,
-তাইতো I অনেক সুন্দর পাখি I চলো আরেকটু কাছে গিয়ে দেখে আসি I মনে হচ্ছে সবুজ -লাল আর বেগুনি রঙের টিয়া পাখি । এই প্রথম দেখলাম I সত্যিই সুন্দর I
এখানে কার্ল শুধু পাখি দেখে মুগ্ধ হয়ে এতো কথা বলেনি I সে আরো জানিয়েছে , এলির দেখা সুন্দর কিছুর প্রতি তার নিজেরও আগ্রহ আছে I
এই বিষয়টিকেই বলা হয়, "টার্নিং টুওয়ার্ডস I
স্ত্রী - চলো, হিমালয় দেখতে যাই I
স্বামী - আমার ঘর ভাড়া দেয়ার টাকা নাই আর উনি হিমালয় যেতে চান !
(কার্ল -চলো যাই I শুনেছি হিমালয় খুব সুন্দর , শীতের সময় যেতে হয় I আমরা কি সত্যিই যেতে পারবো ?)
স্বামী - জানো , আমি কয়েকদিন থেকে ভাবছি মানুষ কেন ভাবেনা, মন কেমন করে সৃষ্টি হলো !
স্ত্রী - পারলে বাজারে যাও I এইসব ফিলোসফির কথা বলে কোন লাভ নাই I
(এলি - আসলেই তাই I মানুষ কেমন করে এতো গভীর ও রহস্যময় মনের সৃষ্টি নিয়ে ভাবেনা ! কেমন করে সে তার সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে থাকে ! )
কার্ল ও এলির সাথে অন্য আট -দশটা দম্পতির এখানেই পার্থক্য I কার্ল কিছু বললে, এলি সেই কথায় আগ্রহ নিয়ে অংশ -গ্রহণ করে I কিংবা এলি কোন ইচ্ছে প্রকাশ করলে, কার্ল সেই ইচ্ছেতে খুব সহজে সাড়া দেয় I
এই তিনটিই হলো বড় প্রেমের মূল কারন I
প্রফেসর জন গটম্যান এবং তার দল চল্লিশ বছর ধরে হাজার হাজার দম্পতির উপর গবেষণা করে এই তিনটি সিক্রেট আবিষ্কার করেছেন I
এবং এই তিনটি সিক্রেট যে কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রেই সত্যি I এমনকি ভাই -বোন, পিতা -সন্তানকিংবা দুই বন্ধু সবার ক্ষেত্রেই এই সিক্রেট ও তথ্য সত্যি I
আমরা সবাই বড় প্রেমের কথা শুনেছি, স্বপ্ন দেখেছি , কল্পনা করেছি কিন্তু নিজের জীবনে সৃষ্টি করার জন্য চেষ্টা করিনি I
প্রেম নিজেও একটা মায়া I একটা সৃষ্টি I