10/03/2026
#সুন্দরগল্প #মায়েদেরসুস্বাস্হ্য
মা তুমি বেশিই চিন্তা কর, রো'গ নেই,তাও রো'গ বাড়াচ্ছো। ডাক্তারের কাছে গিয়ে কি বলো তুমি, গা জ্ব*লে, দুর্বল লাগে, ভালো লাগে না । এইটা কোন রোগ হলো? আর কত ডাক্তার দেখাবো বলো তো। ( সুন্দর গল্পটি শেয়ার করে নিলাম আশা করি সবার ভালো লাগবে।
ছোট বউ উর্মি টেবিলে রাতের খাবারের জন্য প্লেট বাটি এনে সাজিয়ে রাখছে। মেঝ বউ শ্যামা রান্নাঘর থেকে সব তরকারি এনে টেবিলে রাখছে। বড় বউ অনুরাধা রান্নাঘরে সব তরকারি হাড়ি থেকে বাটিতে বাড়ছে।
রাতের খাবারের তোড়জোড় চলছে। যে যেখানে থাকুক সারাদিন, রাতের খাবার টা সবাই একসাথে খেতে চায়। ছোট বেলা থেকে নীলা ওদের মধ্যে অভ্যাসটা করিয়ে দিয়েছে।
পলাশ টেবিলে এসে বসতেই বউরা মাথায় কাপড় তুলে দেয়। ছোট ছেলে তপন এসে বসল, মেঝ ছেলে তরুণ মোবাইলে কথা বলতে বলতে চেয়ার টেনে বসলো।
নীলাও এসে পলাশের বামের চেয়ারে বসলো। বড় ছেলে অরুন এখনো আসে নি। অরুনের ছেলে তুতুল এক সাথে খাওয়ার বায়না করে৷ সবে ক্লাস ফোরে উঠলো। পলাশের ডান পাশেই সে বসে।
অন্য নাতিরা ছোট তাই তারা আগে খেয়ে টিভিতে কার্টুন দেখছে।
অরুন এসে বসতেই নীলা অধীর আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
কি রে খোকা, রিপোর্ট এলো? কি বলল ডাক্তার?
অরুন উত্তর না দিয়ে প্লেটে ভাত নিচ্ছে। নীলা চুপ হয়ে গেলো। ছোট বউ সবাইকে ভাত দিচ্ছে প্লেটে, নীলাকে দিতে এলে,দুই চামচ দেওয়ার পর নীলা বলল,
-থাক থাক, আর দিও না। খেতে ইচ্ছে করে না। কি যে হলো, কিছুই বুঝি না। দুর্বল লাগে। ডাক্তার ও কোন রোগ ধরতে পারছে না।
অরুন বলল,
মা তোমার রোগ না থাকলে কিভাবে ধরবে বলো তো ডাক্তার? সেই কিছু ভিটামিনের ওষুধ ধরিয়ে দিলো। ভালো করে খাওয়া দাওয়া করো।
তপন বলল-
মা তুমি বেশিই চিন্তা কর, রো'গ নেই রো'গ বাড়াচ্ছো। ডাক্তারের কাছে গিয়ে কি বলো তুমি, গা জ্ব*লে, দুর্বল লাগে, ভালো লাগে না । এইটা কোন রোগ হলো? আর কত ডাক্তার দেখাবো বলো তো?
তরুন বলল,
তোমার আসলে প্রতিদিন হাঁটা উচিত, ঘরে বসে থাকতে থাকতে তুমি বিরক্ত হচ্ছো।
রোজ দুধ, ডিম খাও।
নীলা চুপ হয়ে গেল, ভাতের সাথে বেগুন ভাজি মাখতে মাখতে বলল,
খাই তো রে, হাঁটবো কি করে, হাটু যে ব্যা*থা করে। একটু গেলে।
মেঝ বউ বলল- কয়েক দিন গেলে অভ্যাস হয়ে যাবে।
বড় বউ অনুরাধা রান্নাঘর থেকে ইলিশ মাছে বটিটা টেবিলে দিকে এনে রাখতে রাখতে বলল-
মা, আপনার যা খেতে ইচ্ছে করে বলবেন। বানিয়ে দেবো, কারো সাধ্য নেই যে আপনার আদেশ অমান্য করে। তাও প্লিজ এইরকম ভালো লাগে না, ভালো লাগে না, করবেন না। মানুষ জনে বলে আমরা নাকি খেয়াল রাখি না।
নীলা বলল- না, না, তোমার তো যথেষ্ট খেয়াল রাখো। আচ্ছা ঠিক আছে আমি আর বলবো না কিছু,
তরুন বলল- আহ্, তোমাকে বলতে মানা করল নাকি কেউ? তুমি না বললে জানবো কি করে আমরা বল তো?
ইলিশ মাছ খাও, আজ ভালো পেলাম, আনলাম।
তরুন ব্যবসা করে, অরুন আর তপন আর ছোট বউ চাকরি করে। আজ তরুন দুটো বড় ইলিশ মাছ এনেছে।
সবার জন্য করতে গেলে কয় টুকরো আর হয়?
বড় বউ অনুরাধার এখন সংসারের গিন্নি। তাই ও সবার পাতে যাতে পড়ে তাই হিসেব করেই একটু ছোট করেই টুকরো করেছে।
বেশ স্বাভাবিক ভালো বুদ্ধিমত্তার কাজ, ছেলেরাও জানি ব্যাপারটা। ছোট বেলা থেকে দেখেই অভ্যস্ত।
অনুরাধা সবাইকে মাছ দিচ্ছে। আমাকে দিলে এলে বললাম,
আরেক পিস দাও,
অনুরাধা একটু অন্যরকম হাসলো, তবে দিলো দুই পিস। সবাইকে দিয়ে শেষ মাছ টা তুতুল কে তুলে দিয়ে কা*টা বেঁছে দিতে লাগলো। কেউ কোন কথা বলল না, কারণ এইটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
বাবা দুই পিস চাইতেই পারে।
অনুরাধাকে বললাম- বৌমা, তুমি নিলে না যে মাছ? আর নেই?
হেসে বলল-
না বাবা, ঠিক আছে, আমার বেগুন ভাজি আর সবজিতেই খাওয়া হয়ে যাবে। আর দুপুরের ছোট মাছ একটু আছে ওতেই হবে। আপনি খান বাবা। সমস্যা নেই।
প্লেট থেকে হাত তুলে নিয়ে বললাম-
আমাদের বাসায় এখন কয় জন ইনকাম করে বলো তো?
সবাই তাকিয়ে আছে এখন আমার দিকে,
চারজন। কেন বাবা?
আমাদের বাসায় এখন চারজনেই ইনকাম করে, তাও তুমি আজকের আমাকে দুই পিস মাছ দিতে গিয়ে নিজে নিলে না।
চিন্তা করো, আমার একার ইনকামে তিন ছেলে দুই মেয়ে, আমার ভাই -বোন, মা- বাবার বিশাল সংসারে তোমার মা কত বেলা ঠিক এইভাবে নিজের পাতের মাছ টা অন্য কে তুলে দিলো।
কেউ আরেকটু চাইলে ঘরের মায়েদের বউদের নিজের টা তুলে দিতে হয়, কেউ কোন প্রশ্ন তুলি না। যেন এইটা অনাদি কাল থেকে চলে আসা নিয়ম।
তারা খেয়ে পেট তো ভরায়, তবে প্রতিবেলার এমন ভালো মাছ মাংসের টুকরো টা তুলে দিতে দিতে রয়ে যায় পুষ্টি বাকি।
এইটা অনেক গুলো বছর ধরে চলতে চলতে, শরীর বলে আমি আর পারছি না।
তখন হাজার ভিটামিন আর ভালো খাবার দিলেও হাড্ডি তা আর নিতে পারে না।
আমি তোমার মায়ের রোগ অনেক চিন্তা করে বুঝতে পারলাম,
তোমার মায়ের রোগ ডাক্তার ঠিকই ধরেছে, তোমার মায়ের ভিটামিন-এর অভাব। তাই ভিটামিন ওষুধ দেয়। কিন্তু আমাদের কাছে এইটা কোন রোগেই মনে হচ্ছে না। যেন হাস্যকর ব্যাপার।
তোমার মা আমার থেকে দশ বছরের ছোট, কিন্তু দেখো তোমার আমার চেয়ে নীলার রোগ বেশি, দুর্বলতা, গা জ্বালাপোড়া করা, হাটুর ব্যা*থা,চোখের সমস্যা, চুল পড়ে যাওয়া, আরো কত কিছু।
আমিও তো তখন তোমাদের মা কে যত্ন করি নি।
কারণ মায়েদের নিজের জন্য ভালো অংশ টা না রেখে প্রতিবেলা ছেলে মেয়েদের পাতে তুলে দেওয়া ব্যাপার টা আমিও চিরচেনা ভাবেই দেখে এসেছি ।
তাই এখন তোমার জন্য না রেখে আমাকে তুমি দুই পিস মাছ তুলে দেওয়াতে কারো মনে কোন প্রশ্ন উঠে নি এখানে?
অরুনের মনে, তুতুলের মনে। কারণ ওরাও ঠিক এইটাই দেখছে।
মাছের অন্য টুকরো টা অনুরাধার পাতে তুলে দিয়ে বললাম-
তাই এখন থেকে তুমিও জামাই, শ্বশুড় আর বাচ্চাকে সব টা তুলে না দিয়ে নিজের জন্য রাখতে শেখো, বলতে শেখো,
আমিও খাবো তো।
নাহলে বয়স হলে তখন তুমিও তোমার মায়ের মত বলবে শরীর ভালো লাগে না। ছেলে তোমায় বলবে, তোমার কোন রো'গ নেই, শুধু শুধু বানাচ্ছো, স্বামী বলবে, আর কত ডাক্তার দেখাবো?
তখন তুমি যতই ভালো মাছ মাংস ডিম দুধ খাও না কেন তোমার হাড্ডিতে জোর পাবে না। শরীর তা নিতে পারবে না।
তাই সবার সাথে সাথে নিজের খাবারের পুষ্টিমান ঠিক রাখো। এদেশে বয়স হলে ছেলেদের আগে মেয়েদের শরীর আগে ভে*ঙে পড়ে। ঠিক এই কারণে।
তাই যখন তোমার স্বামী বাচ্চাদের জন্য কিছু আনে তখন তাকে মনে করিয়ে দাও তুমিও মানুষ তোমারও সমান পুষ্টি দরকার।
সবাই চুপ হয়ে আছে। নীলার চোখ ছলছল করছে। তখন তুতুল তার পাত থেকে ডিমের অর্ধেক অনুরাধার পাতে তুলে দিলো। অনুরাধা তুতুলের কপালে চুমু এটে দিতে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল ভাতে ।
মা দিবসে মায়ের ভালোবাসা জন্য ধন্যবাদ না দিয়ে মায়ের পাতে ভালো টুকরোটা তুলে দেওয়ার নিয়ম হোক। যাতে আমার মা টায়, শেষ বয়সেও সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে পারে। নিশ্চিত হোক মায়ের সুস্বাস্থ্য।
#মায়েরসুস্বাস্থ্য
#দোলনাবড়ুয়াতৃষা