09/03/2026
#গল্প #গ্লানি #তাইমুরমাহমুদশমীক
গল্পটা আমার মনে এমন দাগ কেটে গেলো, তাই আপনাদের জন্যেও শেয়ার করে নিলাম...🥲❤️🥲
আশা করি একবার পড়েবেন।
★ মেয়েটা পালিয়ে যাওয়ার পর আমার মাথায় প্রথম যে কথাটা এলো, ওইটা শুনলে আপনারা আমাকে পাগল ভাববেন।
আমি ভাবলাম, বাইশ বছরে আমি নিশিকে একটা দিনও মুরগির রানটা দিইনি।
রানটা যেতো রাফির পাতে। রাফি আমার ছোট ছেলে। নিশি পেতো গলার অংশটা, নয়তো পিঠের হাড্ডিওয়ালা টুকরাটা। ও কোনোদিন এ নিয়ে একটা কথাও বলেনি। আর আমিও কোনোদিন ভাবিনি যে এইখানে বলার মতো কিছু আছে।
আমরা হতদরিদ্র ছিলাম না। উত্তরায় ছিমছাম একটা বাসায় থাকতাম। ওর বাবা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে মধ্যমসারির চাকরি করতো। ফ্রিজে মাছ মাংস থাকতো প্রায়ই।
টাকার অভাবে আমি মেয়েকে কম দিয়েছি, তা না। কম দিয়েছি নিয়ম করে, ইচ্ছা করে। কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, এইটাই ওর জন্য ভালো।
ছোটবেলা থেকে আমি ওকে একটা কথাই শিখিয়ে এসেছি। মেয়েদের এতো শখ ভালো না।
ক্লাস সেভেনে স্কুল থেকে কক্সবাজার যাওয়ার ট্রিপ হলো। ওর সব বান্ধবী গেলো। আমার হাতে ছিলো পর্যাপ্ত টাকা। তবু বললাম, মেয়ে মানুষের এতো ঘোরাঘুরি কীসের? বিয়ার পর জামাই নিয়া যাবি।
কলেজে ওঠার পর একদিন দোকানের সামনে একজোড়া কানের দুল দেখে ও দাঁড়িয়ে গেলো। বললাম, এখন না। বিয়ার সময় একবারে বানায়া দিমু।
আরেকদিন ওর বাবা দুই বাচ্চার জন্য আইসক্রিম আনলো। আমি নিশিরটা ফ্রিজে তুলে রাখলাম। বললাম, মেয়ের গলা বসে যাবে। রাফি ওরটা খেয়ে ফেললো। নিশিরটা পরদিন গলে জল হয়ে গিয়েছিলো।
এইগুলার একটাও আমি রাগ করে করিনি। আমি ওকে তৈরি করছিলাম।
ক্লাস নাইনে ওঠার পর আর আমাকে কিছু বলতেও হতো না। টেবিলে খাবার দিলে ও নিজেই মাছ বা মাংসের সবচেয়ে ছোট টুকরাটা তুলে নিতো। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতো, আমার এইটাই ভালো লাগে।
আমার শেখানোটা এতোই ভালো হয়েছিলো যে মেয়েটা নিজের ভাগের অংশ নিজেই কেটেছেটে ছোট করতে শিখে গিয়েছিলো। আমি ওইটার নাম দিয়েছিলাম ভদ্রতা। আত্মীয়দের কাছে গর্ব করে বলতাম, আমার মেয়ে কিচ্ছু চায় না।
আমি ওকে ভালোবাসতাম না, এইটা দুনিয়ার কেউ বলতে পারবে না। জ্বর হলে সারারাত মাথায় পানি ঢেলেছি। রেজাল্টের দিন ওর হাত ধরে স্কুলে গিয়েছি। ওর জন্য আমি সব করেছি।
শুধু একটা কাজ কোনোদিন করিনি। কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি, তুই কী খাবি? কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি, তুই কী চাস?
আমার নিজের মা আমাকে এই কথাগুলাই বলতেন। শ্বশুরবাড়ি গিয়া কতো কিছু মানায়া নেওন লাগবো! এখন থাইকা অভ্যাস কর। আমি অভ্যাস করেছিলাম। আটাশ বছরের সংসারে আমি একটা জিনিসও নিজের জন্য চাইনি। সবাই বলতো, রেহানা বড় লক্ষ্মী মেয়ে।
লক্ষ্মী মেয়ে মানে যে মেয়ের কোনো চাওয়া নাই।
আমি আমার মেয়েটাকেও লক্ষ্মী বানাতে চেয়েছিলাম।
পনেরো বছর ধরে আমি আলমারিতে ওর বিয়ের গয়না জমাচ্ছিলাম। শাড়ি জমাচ্ছিলাম। বলতাম, এইগুলা তোর বিয়ায় দিমু।
সবকিছু আমি ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখছিলাম। মেয়েটা ভবিষ্যৎ পর্যন্ত অপেক্ষা করলো না।
গত এক বছর ধরে ও বদলে গিয়েছিলো। ফোন হাতে নিয়ে একা একা হাসতো। রাতে দেরি করে ঘুমাতো। আমি ভেবেছিলাম পড়ার চাপ।
ছেলেটাকে আমি চিনতাম। আমাদের মোড়ের ওই পাশে থাকে। পড়াশোনা ছেড়েছে বছর তিনেক আগে। রাতে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে থাকে। চোখ দুইটা সবসময় লাল।
একবার আমি ওকে ছেলেটার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও শুধু বললো, তোমরা ওরে চেনো না। বাইরে থেকে দেখতে যেমনই হোক, আসলে সে মানুষ ভালো!
আমি ভেবেছিলাম মেয়েটা বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে। এখন বুঝি, জীবনে প্রথমবার ও এমন একটা কিছু আগলে রাখছিলো, যা ওর একান্তই নিজের।
শুক্রবার সকালে ওর ঘরে ঢুকে দেখি বিছানার চাদরটা টান টান হয়ে আছে। বালিশ ঠিক জায়গায়। টেবিলের উপর একটা কাগজ।
সেখানে লেখা, আম্মু, আমি রনির সাথে চলে যাচ্ছি। আমাকে খুঁজো না। খুঁজে লাভ নাই।
আমার মেয়েটা পালিয়ে যাওয়ার আগেও নিজের বিছানাটা গুছিয়ে রেখে গেছে।
তিনদিন পর ওর এক বান্ধবী এলো। মেয়েটা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বললো, আন্টি, একটা কথা বলবো? রাগ করবেন না।
আমি বললাম, বলো।
ও বললো, ছেলেটা প্রথমদিন নিশিকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়েছিলো। মেনুটা এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, তুমি কী খেতে চাও?
নিশি উত্তর দিতে পারে নাই আন্টি। ও কাঁদতে শুরু করেছিলো। রেস্টুরেন্টের মধ্যে, সবার সামনে।
নিশি পরে আমাকে বলেছিলো, জীবনে কেউ ওকে এই প্রশ্নটা করে নাই।
ছেলেটা ওকে কিছুই দেয়নি। একটা দুলও না, একটা জামাও না। ছেলেটা খালি বলতো, তুমি যা চাইবা তাই হবে।
বাইশ বছরে ওই একটা কথাই ওর কানে ঢুকেছিলো। গেঁথে গিয়েছিলো মনে।
যে মেয়ে সারাজীবন কম পেয়ে এসেছে, তার সামনে কেউ হাত ভরে কিছু বাড়িয়ে ধরলে সে যাচাই করতে যায় না। সে খালি হাতটা ধরে ফেলে।
সেদিন বিকালে আমি ওর আলমারি খুললাম। সব জামা ভাঁজ করা, গোছানো। এক কোণায় একটা শপিং ব্যাগ পড়ে আছে।
তিন বছর আগে চাচাতো বোনের বিয়েতে আমি ওকে একটা জামা কিনে দিয়েছিলাম। প্রাইস ট্যাগটা তখনো খোলা হয়নি।
আমি বলেছিলাম, এখন পরিস না, নষ্ট হইবো। ভালো কোনো অনুষ্ঠানে পরিস।
তিন বছরে ভালো কোনো অনুষ্ঠান আর আসেনি।
রাফি রাতে আমার পাশে এসে বসলো। অনেকক্ষণ পর বললো, আম্মু, আপু একদিন আমারে জিজ্ঞাসা করছিলো, ভাইয়া, তুই চাইলেই পাস ক্যান?
তুই কী উত্তর দিছিলি?
কইছিলাম, জানি না তো! তারপর ভুইলা গেছিলাম।
ভেবেছিলাম কম চাইতে শেখালে মেয়েটা সুখী হবে। আমি বুঝিনি, কম চাইতে শিখলে মানুষ কম পেয়েই খুশি হয়ে যায়। আর যে কম পেয়ে খুশি হয়, তাকে ঠকানো সবচেয়ে সহজ।
মেয়েটা ভালোবাসা চিনলো না। চিনবে কীভাবে? ভালোবাসা দেখতে কেমন হয়, ওইটা তো আমি ওকে নিজের ঘরেই দেখাতে পারিনি।
রাতে খাবার টেবিলে বসে আমি চারটা প্লেটে ভাত বেড়ে ফেললাম।
রাফি কিছু বললো না। ওর বাবাও না। চার নম্বর প্লেটটা টেবিলের ওই মাথায় খালি পড়ে রইলো।
আমি রানটা তুলে ওই প্লেটের উপর রাখলাম।
ততোদিনে বাইশটা বছর কেটে গেছে।
গ্লানি
লেখা:তাইমুর মাহমুদ শমীক
৩১/৮/২০২৬