02/26/2026
বাড়ি ভর্তি মেহমানের সামনে আমার বাবা আমার মায়ের গালে থাপ্পড় মেরেছে। একটু দূরে দাড়িয়েই আমার তিন ফুপু আর দাদি মুচকি মুচকি হাসছে।
এদিকে আমার মা লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাবার থাপ্পড় টা এতোটাই জোরে ছিল যে মায়ের ঠোটের কণা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, ফর্সা গালে পাচ আঙ্গুলের দাগ বসে গেছে।
আমার ছোট বোনটা আমার শার্টের কণা ধরে আমার পিছনে লুকিয়ে আছে। বাবাকে যে সে বড্ড ভয় পায়। আসলে বাবার ভালোবাসাটা কি সেটা আমার ছোট্ট বোনটা জানেই না।
আমার মাকে থাপ্পড় মারার কারণ? এ বাড়িতে অবশ্য কারণ লাগে না আমার মায়ের গায়ে হাত তুলতে।
আজকে আমার ফুপাতো বোন রুমা তার জন্মদিন উপলক্ষে মুরগীর ঝাল তরকারি খেতে চেয়েছিল, যদিও আমার দাদী মাকে তা জানাতে ভুলে গিয়েছিলেন। যেটা সে এখন অস্বীকার করছে।
অন্যদিকে আমার বোন মিহা বেশ কিছুদিন ধরে রোস্ট খাবার বাহানা করছিল। কিন্তু দাদী অনুমতি দেয় নি বিধায় মা রান্না করতে পারেন নি। তার কথায় মিহা এমন কেউ না যে যার কথায় বাসায় রোস্ট রান্না করতে হবে। কিন্তু আজ যেহেতু সুযোগ ছিল তাই সে মিহার পছন্দের রোস্ট রেধেছিল। আর সেটা নিয়েই অনুষ্ঠানের মাঝেই দাদি আর ফুপিরা মিলে বাবার কান ভারি করলো, মা নাকি ইচ্ছা করে মুরগীর ঝাল ফ্রাই না রেধে রোস্ট রেধেছে। মা নাকি ফুফুদেএ হিংসে করে আরো কত কি।
বাসা ভর্তি মেহমানের সামনেই আমার দাদি মাটিতে বসে কাদতে লাগলো। বিলাপ করে বলতে লাগলো যে আমার মা নাকি তার সেবা যত্ন করে না, ফুফুদের হিংসা করে, সারাদিন ঘরে বসে ফোন চালায় আরও কত কি!
এদিকে মা নিশ্চুপ হয়ে চোখের পানি ফেলছে। কারণ মা জানে প্রতিবাদ করলে বাবা আবারও অমানুষের মতো পেটাবে তাকে।
কিন্তু আজ আমি সহ্য করতে পারলাম না। সবার সামনে চিল্লিয়ে উঠলাম। তার বললাম," আর কত মিথ্যে বলবে দাদি। আজ সকাল থেকে আমার মা একা হাতে এতো গুলো মানুষের রান্না করেছে, পাশাপাশি ঘর-দুয়ার পরিষ্কার করেছে একা হাতে,,,,, তুমি আর তোমার মেয়েরা তো ঠিকি ঘরে বসে সিরিয়াল দেখছিলে। আমার মা যদি ঘরে বসে ফোন ই চালাতো তাহলে এতো গুলো রান্না করলো কি। তোমার এই পুরো বাসা সাজালো কে দাদি? "
আমার কথা শুনে দাদি কোনো জবাব খুজে পেলেন না। বাধ্য হয়ে বাবার সামনে আবার ন্যাকা কান্না শুরু করলো, বলতে লাগলো," দেখ বাপ, সামান্য একটু রান্না করছে দেখে খোটা দিয়ে দিল। তোর বউ আমার নাতিটাকেও আমার বিরুদ্ধে উসকায় দিচ্ছে। তুই এর বিচার কর। ছোট মানুষ হয়ে কিভাবে আমার মুখে মুখে তর্ক করে।"
বাবা এবার আমার দিকে রাগী কন্ঠে বললো, " সাজ্জাত বড়দের মাঝখানে কথা বলতে এসো না, আমাকে রাগানোর ফল কিন্তু ভালো হবে না।"
"কি করবে তুমি হ্যা? কি করবে? মারবে আমাকে? যেভাবে আমার মাকে মারো তোমার মা আর বোনদের কথায়? আর পারোই বা কি তুমি। তুমি ভালো সন্তান আর ভাই হলেও ভালো স্বামী আর ভালো বাবা হতে পারো নি বাবা।" অভিমানের সুরে বললাম আমি।
বাবা রাগে আমার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। চেচিয়ে বললেন," এতোগুলো মানুষের সামনে নিজের বাবার সাথে বেয়াদবি করতে লজ্জা করে না তোর? আমার খায়ে আমাকেই তেজ দেখাস।"
" না করে না। যেমন তোমার করে নি লজ্জা এতো গুলো মানুষের সামনে আমার মায়ের গায়ে হাত তুলতে। আর খাওয়ার খোটা দিচ্ছ? কি খাওয়াও তুমি? সব ভালো ভালো বাজার করে দিয়ে আসো ফুপুদের বাসায়। ফুপুরা সেসব ভালো ভালো রান্না করে তোমাকে আর দাদিকে ডেকে নিয়ে খাওয়ায়। কিন্তু ওসব খাওয়ার সময় তুমি কি একবার ভেবেছো তোমার বাচ্চারা বাসায় কি দিয়ে খায়? কোনোদিন তোমার বোনদের বলেছে তোমার বউ বাচ্চার জন্যও যাতে একটু খাবার সাথে দিয়ে দেয়।
বাসায় প্রতিদিন আমরা সবজি বা আলুভর্তা দিয়ে ভাত খাই। দাদির তো সেজ ফুপির বাসায় যেয়ে খেয়ে আসে, কেননা তুমি সেখানে হাত ভরে বাজার দাও। আর তুমি নিজে ব্যাবসার জন্য দুপুরে রাতে হোটেল থেকে খেয়ে আসো। কিন্তু আমরা বাবা? আমাদের বাসায় কয়দিন তুমি মাছ গোস্ত বাজার করে দিয়েছো বলতে পারবে?? আমার মা টুকটাক সেলাই করে যা পায় ওটা দিয়েই শাক সবজি কিনে।
বাবা হওয়ার কি দায়িত্ব পালন করেছো তুমি বাবা?"
আমার কথা শুনে বাবা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। শুধু অবাক চোখে দাদি আর ফুপিদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
দাদি আর ফুপিরা তড়িঘড়ি করে কথা দমানোর জন্য বললেন," আচ্ছা ওসব বাদ দে এখন। যা হওয়ার হয়ে গেছে। আজকে রূমার জন্মদিন। এতোগুলা মানুষের সামনে বাপ বেটার ঝগড়া ভালো দেখায় না। চল সবাই কেক কাটব এখন।"
কিন্তু আমি আজ এতো সহজে এদের ছাড়ব না। আজকে আমার মায়ের উপর, আমাদের প্রতি হওয়া অন্যায়ের শেষ আমি দেখেই ছাড়ব।
ছড়া মেজাজে দাদিকে বললাম," কিসের বাদ দিব? যখন তোমার ছেলে আমার মায়েএ গায়ে হাত তুলেছিল, সেটা খুব ভালো দেখাচ্ছিল। কই তখন তো থামাতে আসো নি। এখন কেনো থামাচ্ছো?
তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম," আচ্ছা বাবা তুমি কি সত্যি আমাদের বাবা? না মানে, প্রতি বছর আমাদের বাসায় আমার ফুপাতো ভাই বোনদের জন্মদিন পালন করা হয়, কিন্তু কোনোদিন আমার আর আমার বোনের জন্মদিন কেনো পালন করা হয় না?"
সাথে সাথে আমার বড় ফুপু খেকিয়ে উঠলেন," কি রে তুই কি তোর ভাই বোনদের হিংসে করিস নাকি?"
তাচ্ছিল্য হেসে বললাম," হিংসে করি না। শুধু জানতে চাই আমার আর আমার বোনের জন্মদিন পালন করা কেনো হয় না? বাবা উত্তরটা দাও দয়া করে।"
করিম শেখ এখনো নিশ্চুপ, কি উত্তর দিবেন তিনি! আসলেই তো তার সন্তানদের একটি জন্মদিনও আজ পর্যন্ত পালন করা হয় নি।
আমি আবারও বললাম," প্রতি ঈদে তোমার বোনদের বোন জামাইদের দামি দামি কাপড় দেও, তোমার ভাগিনা ভাগ্নিদের গায়েও থাকে মার্কেটের সবচেয়ে দামি কাপড়টা। কিন্তু আমার মাকে দেওয়া হয় ৩৫০ টাকার প্রিন্টের শাড়ি, আমাকে দেয়া হয় রাস্তার পাশের ভ্যান থেকে কেনা ১০০ টাকা সস্তা শার্ট, আর আমার বোনটাকে দেয়া হয় ৩০০ টাকার জামা। এই যে বাবা দেখো আজ যেই শার্টটা পরেছি এটাও দেলোয়ার কাকার ভ্যান থেকে দাদি কিনে দিয়েছিল ঈদে, দাম ১০০ টাকা। কিন্তু তোমার ভাগিনা ভাগ্নিদের যে কাপড় দেয়া হয় সেগুলোর দাম হয় ৩০০০ টাকার উপরে। বাবা কেনো এই বৈষম্য??? উত্তর দেও। চুপ করে আছো কেনো??"
এদিকে রোকেয়া বেগম নাতির কথা শুনে রীতিমতো ঘামছে, সে ঘটনা আবার ধামাচাপা দিতে নাটক শুরু করলেন, নাটক করে যায়ে নিলুফার পায়ে পরে গেলেন, কাদতে কাদতে বললেন," এই নে তোর পায়ে ধরলাম, তবু আমারে এমন বদনাম করিস না। একটু নাহয় আমার মেয়ের ঘরের নাতি নাতনিদের ভালো কাপড় দিছি, তাই বলে এতো হিংসা তগো পেটে।"
দাদির নাটক দেখে আমি আবার কিছু বলতে যাব তার আগেই বাবা আমার গালে আরেকটা থাপ্পড় দিলেন। চেচিয়ে বললেন, " ঘরে যা বেয়াদপ।"
মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো," এই শিক্ষা দিছিস আমার বাচ্চাগুলোকে।"
সবাইকে অবাক করে দিয়ে মা প্রথমবারের মতো তাচ্ছিল্য হেসে বললো," আপনার বাচ্চারা আর ছোট নেই যে মুখ বুজে অন্যায় সহ্য করবে। আমার ছেলেটা সাইন্স নিয়েছে এবার, কিন্তু ওকে একটাও টিউশনি নিয়ে দেন নি, এটা নাকি টাকা নষ্ট। কিন্তু আপনার ভাগিনা ভাগ্নিরা ঠিকি চারটা করে টিউশনিতে ঢুকেছে, যার টাকা আপনি দেন। আমার ছেলে মেয়ে পড়ে সরকারি স্কুলে। কিন্তু আপনার বোনের বাচ্চাদের ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন প্রাইভেট স্কুলে। আমার মেয়েটার নাচের শখ ছিল। কিন্তু আপনার মা আমার বাচ্চাটাকে নাচের ক্লাসে যেতে দেয় নি। এসব নাকি টাকা নষ্ট। কিন্তু তার মেয়ের ঘরের নাতি নাতনি ঠিকি নাচ গান শিখছে, তখন তা টাকা নষ্ট হয় না। আমার মেয়েটাকে আজ পর্যন্ত কোলে নিয়ে আদর করেন নি। কিন্তু আপনার ভাগ্নিদের ঠিকি কোলে নিয়ে পুরো পাড়া ঘুরিয়ে আনেন। কেনো? আমার মেয়েটার কি বাবার ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার নেই? আসলে এতো বছর মুখ বুজে ছিলাম শুধু সন্তানগুলোর দিকে তাকিয়ে যে তাদেরকে বাবা ছাড়া করতে চাই নি। কিন্তু আজ নিজের সন্তানের মুখে অভিযোগ গুলো শুনে, নিজের মেয়ের মুখে ভয় দেখে বুঝতে পারলাম ওরা আসলে বাবা ছাড়াই তারা সুখ থাকবে।" বলেই ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে ঘরে চলে গেল নিলুফা।
নিলুফা যেতেই সব যেন আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পরলো। রোকেয়া বানু আর তার তিন মেয়ে সবাইকে তাড়া দিতে লাগলো খাওয়ার জন্য। স্থির হতে পারল না করিম শেখ, সে যেয়ে বসে থাকলো কোণার চেয়েরে।
একটু পর হাতে দুটো ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসলো নিলুফা। সাথে তার দুই বাচ্চা।
স্ত্রীকে এভাবে রাতে ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পরতে দেখে অবাক হলেন করিম শেখ। এগিয়ে এসে নিলুফার হাত ধরে সে বললো, "এই রাতে এসব কোন নতুন নাটক শুরু করলে?"
"নাটক না, বাচ্চাদের একটা সুন্দর জীবন দেওয়ার চেষ্টা করছি। কারণ এবাড়িতে তা সম্ভব নয়। তাদের বাবা থেকেও না থাকার মতো।"
" যা বলছো ভেবে বলছো তো? এ বাড়ির চৌকাঠ পার করলে, আর ঢোকার অনুমতি পাবে না।"
"এটাই তো চাই, ১৬ বছর সহ্য করেছি, তবে আর নয়। এবার মুক্তি চাই।"
এ পর্যায়ে দাদি এসে বললেন, " এসব কি বলছো বউমা। ঘরে যাও। বাবা মা কি শিক্ষা দেয় নি তোমাকে। ছোটলোক মেয়ে।
এরপর ফুপিরাও কি কি যেন বলছিল, কিন্তু মা সেসবে কান না দিয়ে আমাদের হাত ধরে বেরিয়ে পরলো।
রিক্সায় বসে আলগোছে মায়ের মুখে তাকালাম, দেখলাম তার মুখে মুক্তির হাসি, আত্মবিশ্বাসের হাসি, আত্মসম্মানের হাসি।
নিলুফার_সংসার
পর্ব_১
ইলোরা_ফারদিন