11/03/2026
#জানাঅজানা
আমার বাড়ি শীতকালে এনার্জি পজিটিভ হয়ে যায়। কারন শীতে লোড কম, এসি চলে না। ফ্রিজ কম চলে, গরম জল ছাদের সোলার গিজার থেকে আসে আর ছাদে আছে ২.৫ kW-P এর সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট। কিন্তু সমস্যা হল - এই এনার্জি CESC -র গ্রীডে ঢোকে বিনি পয়সায়। CESC কিছুতেই ডিফারেনশিয়াল মিটার দেবে না। আমায় না, কাউকেই দেয় না। তখন মনে হত - দুর ছাই, পাশের মুদির দোকানটাকে CESC র থেকে কম ট্যারিফে বেচে দিই এক্সট্রা পাওয়ার। কিন্তু আইনগত ভাবে সেটা করা যায় না। P2P PPA (পাওয়ার পার্চেস এগ্রিমেন্ট) করা যায় না।
এবার আসি এ-আই ইম্প্যাক্ট সামিটে কি একখানা ইউজ কেস দেখান হয়েছে। সাংঘাতিক জিনিস মশাই। ইমপ্লিমেন্ট নিঃসন্দেহে টাফ। তবে ইউপিআই কেও আমরা সুপার টাফ ভেবেছিলাম। নয় কি? এই জিনিস স্মার্ট গ্রীডের নিয়ম কানুন মেনে নামাতে পারলে যে কি হবে, ভাবতেই শিহরন হচ্ছে।
আর ভনিতা না করে আসল ব্যাপারে আসা যাক!
***
মীরাটের কৃষক অরুণ সিংয়ের বাড়ির টিনের ছাদে কয়েকটা সোলার প্যানেল। ভোরের রোদ উঠতেই নিয়ম করে ইলেক্ট্রিসিটি তৈরি শুরু করে।
আগে কী হতো? নিজের বাড়ির পাখা, লাইট, পাম্প চালিয়ে যা বাঁচত, সেটা নামমাত্র দামে চলে যেত সরকারি গ্রিডে, আর বাকি এনার্জি আসলে নষ্টই হয়ে যেত।
কিন্তু ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ অরুণ এক কাজ করলেন। সেই বাড়তি ৬ ইউনিট ইলেক্ট্রিসিটি তিনি সোজা বিক্রি করলেন দিল্লির এক গার্মেন্টস দোকানদার লক্ষ্মীর কাছে। মাঝখানে কোনো ডিসকম নেই, কোনো ফিক্সড ট্যারিফ নেই, শুধু একটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আর দুইজন মানুষের মধ্যে সরাসরি লেনদেন।
এর বদলে তার হাতে এলো ৩০ টাকা। ঘটনাটা ছোট, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভারতের ভবিষ্যতের মালটি-মোডাল ইলেক্ট্রিসিটি মার্কেটের একটা ঝলক।
***
ইউপিআই থেকে এনার্জি স্ট্যাক..
যেভাবে ইউপিআই টাকার লেনদেনকে “যার ফোন আছে, তারই ব্যাংক” টাইপ গণতন্ত্রী ব্যপার করে দিয়েছে, ঠিক সেই ভাবনাটাই এবার ঢুকছে ইলেক্ট্রিসিটির জগতে।
ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রক ইন্ডিয়া এনার্জি স্ট্যাক বা আইইএস নামের একটা ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বানাচ্ছে, যা পাওয়ার সেক্টরের জন্য হবে আধার আর ইউপিআই এর মতোই এক কমন ডিজিটাল ব্যাকবোন।
এর লক্ষ্য খুব সোজা। ইলেক্ট্রিসিটি মানে শুধু বিল আর লোডশেডিং নয়, বরং একটা ওপেন ডিজিটাল মার্কেট, যেখানে আপনি চাইলে বায়ার, চাইলে সেলার, আবার চাইলে দুটোই হতে পারবেন।
এই জন্যই মিনিস্ট্রি অব পাওয়ার একটা টাস্কফোর্স বানিয়ে ১২ মাসের প্রুফ অব কনসেপ্ট চালাচ্ছে, যাতে বাস্তবে কীভাবে এই স্ট্যাক কাজ করবে, সেটা ট্রায়াল দিয়ে বোঝা যায়।
***
প্রোসিউমার, আলো বিক্রি করতে শেখা মানুষ!
এই নতুন ইকোসিস্টেমে আপনি শুধু কনজিউমার নন, আপনি প্রোসিউমার। অর্থাৎ আপনি যেমন ইলেক্ট্রিসিটি কনজিউম করেন, তেমনি ইলেক্ট্রিসিটি উৎপাদনও করতে পারেন।
যার বাড়ির ছাদে সোলার আছে, কোনো হাউজিং সোসাইটির রুফটপ প্ল্যান্ট, কিংবা ছোট ব্যবসার গ্যারেজের সোলার, এরা সবাই তাদের বাড়তি ইলেক্ট্রিসিটি সোজা অন্য কারও কাছে বিক্রি করতে পারবে।
এটা একদম নতুন পাওয়ার ডায়নামিক্স। কয়লার বা তেলের যুগে যেখানে সব এনার্জি কন্ট্রোল করত কয়েকটা বড় কোম্পানি বা রাষ্ট্র, সেখানে সোলার আর উইন্ডের যুগে প্রথমবার সাধারণ মানুষ নিজেই ছোট ছোট পাওয়ার প্ল্যান্ট হয়ে উঠছে।
অরুণ আর লক্ষ্মীর সেই ৬ ইউনিটের লেনদেন আসলে এই ধারণার প্রমাণ, মানুষই এবার এনার্জি মার্কেটের প্লেয়ার।
***
ভিতরের টেকনোলজি, একেবারে সহজ ভাষায়..
গল্পের পেছনে টেকনোলজি বেশ ভারি, কিন্তু ভেঙে বললে খুব জটিল না।
প্রতিটা বাড়ি, দোকান, ফার্মে লাগানো থাকে স্মার্ট মিটার, যেটা রিয়েল টাইমে ডেটা পাঠায়, কতটা ইলেক্ট্রিসিটি তৈরি হচ্ছে, কতটা খরচ হচ্ছে।
এই ডেটার ওপর এআই চালিত সিস্টেম আগে থেকেই আন্দাজ করে কোন এলাকায় এখন কতটা চাহিদা, আর কোথায় সারপ্লাস।
ব্লকচেইন বা একই রকম সিকিয়োর ডিজিটাল লেজার প্রতিটা লেনদেনকে ট্যাম্পার প্রুফভাবে রেকর্ড করে রাখে, যাতে কেউ পরে এসে ডেটা পাল্টাতে না পারে।
অটোমেটেড ট্রেডিং অ্যালগরিদম বায়ার আর সেলারকে ম্যাচ করিয়ে দেয়, একদম শেয়ারবাজারের অর্ডার ম্যাচিং সিস্টেমের মতো। শুধু এখানে ট্রেড হচ্ছে টাকা নয়, কিলোওয়াট-আওয়ার।
ফলে অরুণের মিটার জানাচ্ছে, এখন অতিরিক্ত ৬ ইউনিট ইলেক্ট্রিসিটি আছে। ওদিকে লক্ষ্মীর দোকানের মিটার বলছে, গ্রিড থেকে না নিয়ে সে যদি লোকাল সোলার কিনতে পারে, তাহলে তারও লাভ, আর গ্রিডের ওপর চাপও কমে।
***
সরকার, রেগুলেটর আর প্রথম আন্তঃরাজ্য পাইলট..
এই সবকিছুই কিন্তু “অ্যাপ বানালাম, চালু করে দিলাম” টাইপ বিষয় না। এর গায়ে জড়িয়ে আছে নিয়ম, ট্যারিফ, গ্রিডের সুরক্ষা, সব।
উত্তর প্রদেশ ইলেক্ট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশন বা ইউপিইআরসি প্রথমে পিয়ার টু পিয়ার সোলার ট্রেডিংয়ের জন্য ফ্রেমওয়ার্ক বানিয়েছিল। তারপর ২০২৬ এ তারা এমন একটা পাইলট অনুমোদন করেছে, যেটা সরাসরি উত্তর প্রদেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত আন্তঃরাজ্য ট্রেড করার অনুমতি দেয়।
এই পাইলটে পিভিভিএনএল এর আওতায় থাকা প্রোসিউমাররা দিল্লির কনজিউমারের কাছে সবুজ ইলেক্ট্রিসিটি বিক্রি করতে পারবেন, আর সারা সিস্টেমটা চলবে ইন্ডিয়া এনার্জি স্ট্যাকের ডিজিটাল ফ্রেমওয়ার্কের ওপর।
ইউপিইআরসি বলেছে, গ্রিডের সুরক্ষা, ডিসকমের রেভিনিউ আর কনজিউমারের ট্যারিফ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটা মাথায় রেখেই আপাতত ছয় মাসের জন্য সীমিত স্কেলে এই এক্সপেরিমেন্ট।
***
প্রতি ইউনিটে ৪২ পয়সা, এটাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ফি!
এখন প্রশ্ন আসবে, প্ল্যাটফর্ম চালু রাখার খরচ কে দেবে?
ইউপিইআরসি অর্ডারে বলেছে, প্রতি ইউনিট ইলেক্ট্রিসিটির জন্য ০.৪২ টাকা অর্থাৎ ৪২ পয়সা ট্রানজ্যাকশন চার্জ থাকবে, আর বায়ার ও সেলার দুজনই সমান ভাগে সেটা বহন করবে।
অর্থাৎ অরুণ যেটা বিক্রি করছেন, তার একটা ছোট্ট অংশ খরচ হচ্ছে এই ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার চালাতে, সার্ভার, সাইবার সিকিয়োরিটি, অ্যালগরিদম, সাপোর্ট সব মিলিয়ে।
এটাকে আপনি ইউপিআই এর এমডিআর বা প্ল্যাটফর্ম ফি এর গ্রিন এনার্জি ভার্সন ভাবতে পারেন। শুধু এখানে ফি আরেকটু বেশি ট্রান্সপারেন্ট আর রেগুলেটেড।
***
ইন্ডিয়া এনার্জি স্ট্যাক আসলে কী বানাচ্ছে?
মিনিস্ট্রি অব পাওয়ার যেটা আঁকতে চাইছে, সেটা একটা একক সফটওয়্যার না। বরং পুরো পাওয়ার সেক্টরের জন্য একটা কমন ডিজিটাল লেয়ার।
প্রত্যেক কনজিউমার, অ্যাসেট যেমন ট্রান্সফরমার, ফিডার, সোলার প্ল্যান্ট, আর লেনদেনের জন্য ইউনিক ডিজিটাল আইডেন্টিটি থাকবে।
রিয়েল টাইম, কনসেন্ট বেসড ডেটা শেয়ারিং থাকবে। মানে আপনার ডেটা আপনার অনুমতি ছাড়া কেউ ব্যবহার করতে পারবে না, কিন্তু আপনি চাইলে থার্ড পার্টি সলিউশনও প্লাগ ইন করতে পারবেন।
ওপেন এপিআই থাকবে, যাতে স্টার্টআপ, ডিসকম, রেগুলেটর, সবাই একই কমন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে অ্যাপ্লিকেশন বানাতে পারে।
ইউটিলিটি ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম বা ইউআইপি এই ডেটার ওপর অ্যানালিটিক্স চালিয়ে ডিসকম আর পলিসিমেকারদের জন্য ড্যাশবোর্ড, ইনসাইট, অ্যালার্ট তৈরি করবে।
পিয়ার টু পিয়ার এনার্জি ট্রেডিং এই স্ট্যাকের প্রথম ভিজিবল ইউজ কেস। মানে যেটা সাধারণ মানুষ নিজের চোখে দেখছে আর ফোনের স্ক্রিনে ছুঁয়ে অনুভব করতে পারছে।
***
এনার্জি মানে কেবল ইউটিলিটি নয়, একটা মার্কেট..
আমরা এখনো ইলেক্ট্রিসিটিকে “বিল চলে এসেছে”, “লোডশেডিং হবে কি” এই মানসিক ফ্রেমে দেখি।
আইইএস যদি ঠিকমতো দাঁড়ায়, তাহলে ইলেক্ট্রিসিটি একটা পিওর ডিজিটাল মার্কেটের প্রোডাক্ট হয়ে উঠতে পারে। একদম ডেটা প্যাক কেনাবেচার মতো, শুধু এখানে কমোডিটি হলো কিলোওয়াট আওয়ার।
এতে তিনটে বড় বদল হতে পারে।
১. ছোট ছোট প্রোসিউমারের ইলেক্ট্রিসিটিও সিস্টেমেটিকভাবে ট্র্যাক, শিডিউল আর সেটল করা যাবে বলে গ্রিডে রিনিউয়েবলস ঢোকানো সহজ হবে।
২. ডিসকমের কাজ শুধু বিল পাঠানো আর লাইন মেরামত করা থেকে সরে গিয়ে ডেটা চালিত সিস্টেম অপারেটর হয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
৩. কনজিউমার প্যাসিভ ইউজার থেকে অ্যাকটিভ প্লেয়ার হয়ে উঠবেন। কখন গ্রিড থেকে নেবেন, কখন লোকাল সোলার থেকে কিনবেন, কখন নিজের সারপ্লাস বিক্রি করবেন, এগুলো নিয়ে তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন।
***
ইন্ডিয়া যখন আগেই বিশ্বকে আধার আর ইউপিআই দেখিয়েছে, তখন খুব অদ্ভুত কিছু হবে না যদি কয়েক বছর পর “ইন্ডিয়া এনার্জি স্ট্যাক” শব্দটা গ্লোবাল এনার্জি সামিটের পাওয়ার-পয়েন্টে নতুন রেফারেন্স মডেল হয়ে দাঁড়ায়।
(শান্তনু সোম)